নবম পে স্কেলে ১১-২০ গ্রেডের কর্মীদের ভাতা বাড়ছে পাঁচ গুণ

নবম পে স্কেলে ১১-২০ গ্রেডের কর্মীদের ভাতা বাড়ছে পাঁচ গুণ
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী ছবি

দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আসছে বহুল আলোচিত নবম জাতীয় পে স্কেল-২০২৬। নতুন বেতন কাঠামোতে মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের জন্য টিফিন ভাতা পাঁচ গুণ বাড়িয়ে মাসিক ১ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে, যা চাকরিজীবীদের মধ্যে ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বর্তমানে অষ্টম জাতীয় পে স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীরা মাসিক ২০০ টাকা টিফিন ভাতা পান। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে এই ভাতা দীর্ঘদিন ধরেই বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অভিযোগ ছিল। নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে এই ভাতা বেড়ে ১ হাজার টাকায় উন্নীত হবে, যা বর্তমানের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি।

 

জাতীয় বেতন কমিশন সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত এক দশকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, খাদ্যসামগ্রী এবং জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অথচ সরকারি কর্মচারীদের টিফিন ভাতা অপরিবর্তিত ছিল। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় বেতন কমিশন টিফিন ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে।

 

প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১ থেকে ২০ গ্রেডের সরকারি কর্মচারী এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই সুবিধার আওতায় আসবেন। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মচারী ও শিক্ষকদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

তবে শুধু টিফিন ভাতাই নয়, নতুন পে স্কেলে বেতন কাঠামোর প্রায় সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন বৃদ্ধি। বর্তমানে এ গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা হলেও নতুন পে স্কেলে তা বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন বেতনে কর্মরতদের আয় দ্বিগুণেরও বেশি বাড়তে পারে।

 

এ ছাড়া বৈশাখী ভাতার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে সরকারি কর্মচারীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা পান। নতুন কাঠামোতে এটি বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। ফলে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে কর্মচারীরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ পাবেন।

 

পরিবারের শিক্ষা ব্যয় বিবেচনায় সন্তানদের শিক্ষা ভাতাও বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে এই ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকা হলেও তা বাড়িয়ে ২ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলায় এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

নতুন পে স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা। প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় দাবি ছিল চিকিৎসা ব্যয় কমাতে স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা চালু করা। কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বাড়তি সুরক্ষা পাবেন।

 

সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে এমন সরকারি কর্মচারীদের জন্যও বিশেষ সুবিধার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কমিশন তাদের জন্য মাসিক অতিরিক্ত ২ হাজার টাকা ভাতা প্রদানের সুপারিশ করেছে, যা পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ কিছুটা কমাতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীরা টিফিন ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, বর্তমান বাজারে ২০০ টাকায় এক মাসের টিফিন ব্যয় মেটানো প্রায় অসম্ভব। ফলে ভাতা বৃদ্ধি শুধু আর্থিক সুবিধাই নয়, বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নবম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে খুব শিগগিরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে।

 

দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পর আসতে যাওয়া নতুন পে স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা এবং কর্মক্ষেত্রে উৎসাহ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য এটি হতে পারে বড় ধরনের স্বস্তির বার্তা।


সম্পর্কিত নিউজ