{{ news.section.title }}
বিশ্বকাপের ১০০০তম ম্যাচে তিউনিসিয়াকে উড়িয়ে দিল জাপান
গত সপ্তাহে সুইডেনের কাছে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর সাবরি লামুচিকে বরখাস্ত করে তিউনিসিয়া। তার জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয় হার্ভে রেনার্ডকে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব শুরু হওয়ার পর এটি ছিল তাদের সপ্তম কোচ পরিবর্তন। তবে মাঠের বাস্তবতা বদলায়নি।
আত্মবিশ্বাসহীন ও রক্ষণে দুর্বল একটি দল যে-ই কোচ হোক না কেন, সেই একই সমস্যায় ভুগবে। জাপানের বিপক্ষে তিউনিসিয়ার পারফরম্যান্সেও তার ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। ফেইনুর্দের স্ট্রাইকার আয়াসে উয়েদার অনুপ্রেরণাদায়ী পারফরম্যান্সে জাপান সহজ জয় তুলে নেয়। ম্যাচে দুটি গোল করেন তিনি, পাশাপাশি বুদ্ধিদীপ্ত ও সৃজনশীল ফুটবলে আক্রমণভাগকে নেতৃত্ব দেন।
রেনার্ড খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করার জন্য সময় পেয়েছিলেন মাত্র তিন দিন। ২০১২ সালে জাম্বিয়াকে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের শিরোপা জেতানো এবং ২০১৫ সালে আইভরি কোস্টকে ২৩ বছরের শিরোপাখরা কাটিয়ে দ্বিতীয় ভিন্ন দল হিসেবে আফ্রিকা কাপ জেতানোর কৃতিত্ব থাকলেও তিনি নিজেই বলেছেন, তিনি কোনো “জাদুকর” নন।
ফরাসি ফুটবলের মূলধারায় সোশো, লিল এবং ফ্রান্স নারী দলের দায়িত্ব নিয়ে সফল হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন রেনার্ড, কিন্তু সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ৫৭ বছর বয়সী এই কোচ এখন যেন মেনে নিয়েছেন, ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলের বদলে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের উচ্চাকাঙ্ক্ষী জাতীয় দলগুলোর সঙ্গেই তার ভবিষ্যৎ বেশি জড়িত। তার পরিচিত সাদা শার্ট এখনও আছে, তবে একসময় যেটিকে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করা হতো, সেই সৌভাগ্য যেন এখন আর সঙ্গ দিচ্ছে না। অবশ্য তিউনিসিয়ার এই ব্যর্থতার দায় বাস্তবিক অর্থে রেনার্ডের ওপর চাপানো কঠিন। তিনি কেবল সেই উচ্চ বেতনের কোচ, যার কাজ এখন ব্যাখ্যা করা-কীভাবে তিউনিসিয়া এত দ্রুত বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেল।
ম্যাচ শেষে রেনার্ডের কণ্ঠে ছিল হতাশা। তিনি বলেন, “আমরা আরও ভালো প্রতিক্রিয়া ও ভালো পারফরম্যান্স আশা করেছিলাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ব্যবধানটা অনেক বড় হয়েছে, তবে এটি দুই দলের মধ্যকার পার্থক্যই তুলে ধরে। আজ আমাদের রক্ষণভাগের সংগঠন ভালো ছিল না। দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম ২০ মিনিটে আমরা কিছুটা শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিলাম, কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না।”
বিশ্বকাপ ইতিহাসের এক মাইলফলক ম্যাচ ছিল এটি। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে এটি ছিল ১,০০০তম ম্যাচ। ৯৬ বছর আগে উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতে ফ্রান্স-মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্র-বেলজিয়ামের একযোগে ম্যাচ দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা এসে পৌঁছেছে মেক্সিকোর গরম ও আর্দ্র মনতেরেতে। আর সেখানেই বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো এশিয়ান দলের সবচেয়ে বড় জয়ের রেকর্ড গড়ে জাপান।
ম্যাচের আগের দিন ভয়াবহ বজ্রঝড় ও ভারী বৃষ্টিতে স্টেডিয়াম চত্বর প্লাবিত হয়েছিল। প্রধান সড়ক পরিণত হয়েছিল স্রোতস্বিনী জলধারায়। তবে ম্যাচের দিন সেই দুর্যোগের চিহ্ন বলতে ছিল কেবল রাস্তা ও কংক্রিটের ওপর জমে থাকা কাদার স্তর।
তিউনিসিয়ার সমস্যাগুলো অবশ্য এত সহজে আড়াল করা যায়নি। রেনার্ড তার পূর্বসূরি লামুচির ব্যবহৃত ফরমেশনই ধরে রাখেন এবং মাত্র তিনটি পরিবর্তন আনেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ছিল গোলবারের নিচে। সুইডেনের বিপক্ষে প্রথম দুই গোল হজমের ক্ষেত্রে আংশিক দায় থাকা মুহিব শামাখের জায়গায় খেলেন আইমেন দাহমেন। কিন্তু একই ধরনের একাদশের ফলও হলো প্রায় একই। পুরো ম্যাচেই তিউনিসিয়া ছিল ছন্দহীন।
জাপানের কোচ হাজিমে মোরিয়াসু ম্যাচ শেষে বলেন, “খেলোয়াড়রা প্রতিপক্ষ নিয়ে অতিরিক্ত ভাবেনি এবং আমরা যা করতে চেয়েছিলাম, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পেরেছে।”
ম্যাচের মাত্র ৭০ সেকেন্ডের মাথায় জাপান পেনাল্টি পেতে পারত। ঘুরে দাঁড়ানোর সময় উয়েদাকে ফাউল করেন এলিয়েস স্কিরি। কিন্তু রোমানিয়ান রেফারি ইস্তভান কোভাচ পেনাল্টি দেননি। আরও বিস্ময়কর ছিল, স্পষ্ট ফাউল হওয়া সত্ত্বেও ভিএআরও হস্তক্ষেপ করেনি।
তবে জাপানকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। চতুর্থ মিনিটেই এগিয়ে যায় তারা। দারুণ এক আক্রমণে তিউনিসিয়ার রক্ষণভাগ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং বাম প্রান্তে জায়গা পান কেইতো নাকামুরা। তার নিচু ক্রস ভিড়ের মধ্যে গিয়ে অসতর্ক দাইচি কামাদার গোড়ালিতে লেগে জালে জড়ায়। সাইডলাইনের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা রেনার্ডের মুখে তখন ছিল বিস্ময় ও আতঙ্কের মিশ্র অভিব্যক্তি।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করা দল থেকে রেনার্ডের চেয়েও বেশি পরিবর্তন করেছিলেন মোরিয়াসু। তাকেফুসা কুবো চোটের কারণে খেলতে পারেননি, আর বাকি পরিবর্তনগুলো ছিল কৌশলগত। সেগুলোও দারুণভাবে কাজে দেয়। আগের ম্যাচে বল ছাড়া বেশি সময় কাটানো জাপান এদিন শুরু থেকেই আক্রমণের পর আক্রমণ চালায়। ডিলান ব্রনের শেষ মুহূর্তের ক্লিয়ারেন্স এবং দাহমেনের দুর্দান্ত সেভ না থাকলে ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিটেই ব্যবধান আরও বাড়তে পারত।
তবে দ্বিতীয় গোল আসা ছিল সময়ের অপেক্ষা। ৩১ মিনিটে সেটিই করেন উয়েদা। অনেকটা ফাঁকা জায়গায় বল পেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে জুনিয়া ইতোর দৌড় উপেক্ষা করে তিনি নিচু শট নেন। মনতাসের তালবির দুই পায়ের ফাঁক গলে বল জড়িয়ে যায় জালে। এবার রেনার্ডের মুখে ছিল অসহায় হাসি।
বিরতির পর রক্ষণ কিছুটা গুছিয়ে তুলতে পেরেছিলেন রেনার্ড। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভিআইপি বক্সে বসে ম্যাচটি দেখছিলেন হিসাকো, যিনি সম্রাট তাইশোর নাতি নোরিহিতোর বিধবা স্ত্রী। ২০০২ বিশ্বকাপের আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো জাপানের রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া সফর করেছিলেন তিনি ও তার স্বামী। সেদিন তিনি দেখলেন এমন একটি জাপান দলকে, যারা দ্বিতীয়ার্ধে শক্তি সঞ্চয় করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেই অনেক দুর্বল এক প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করেছে।
৬৯ মিনিটে উয়েদার ফ্লিক থেকে তৃতীয় গোল করেন ইতো। অফসাইড ট্র্যাপ ভেঙে দেন মোহাম্মদ আমিন বেন সালিদা, যিনি বাকি ডিফেন্ডারদের তুলনায় অন্তত তিন থেকে চার গজ পেছনে অবস্থান করছিলেন। রিপ্লে দেখে অবিশ্বাসে মাথা নাড়তে থাকেন রেনার্ড। পরে ড্রিংকস ব্রেকের বেশিরভাগ সময় তিনি ঠোঁট চেপে দূরে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
এরপর উয়েদার বুদ্ধিদীপ্ত লুপিং হেডারে আসে চতুর্থ গোল। তখন রেনার্ডকে দেখাচ্ছিল পুরোপুরি ভেঙে পড়া একজন মানুষ হিসেবে।
দীর্ঘ কোচিং ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতায় রেনার্ড নিশ্চয়ই কখনও ভাবেননি যে তিউনিসিয়ার চাকরিটি দীর্ঘমেয়াদি হবে। তবে সাম্প্রতিক ইতিহাস বিবেচনায় বলা যায়, আগামী বৃহস্পতিবার নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচ পর্যন্ত দায়িত্বে টিকে থাকলেও নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতে হবে তাকে।