{{ news.section.title }}
সাকার হ্যাটট্রিকে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ শেষ করল ইংল্যান্ড
বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভেঙেছিল দুই দলেরই। তাই মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ব্রোঞ্জ ফাইনালকে অনেকেই আনুষ্ঠানিকতার ম্যাচ বলেই মনে করেছিলেন। কিন্তু মাঠের লড়াই সেই ধারণাকে পুরোপুরি ভুল প্রমাণ করেছে। গোলের বন্যা, একের পর এক নাটকীয় মুহূর্ত, রেকর্ড ভাঙা পারফরম্যান্স আর শেষ বাঁশি পর্যন্ত টানটান উত্তেজনায় ভরা এক ম্যাচে ফ্রান্সকে ৬–৪ গোলে হারিয়ে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করেছে ইংল্যান্ড। একই সঙ্গে ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর পুরুষদের বিশ্বকাপে এটিই ইংল্যান্ডের সেরা অর্জন এবং দেশের বাইরে অনুষ্ঠিত কোনো বিশ্বকাপে তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাফল্য।
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচকে এখন ফিফা ‘ব্রোঞ্জ ফাইনাল’ নামে আখ্যায়িত করে। তবে এবারের আসরে এই ম্যাচটি শুধু ব্রোঞ্জ পদকের লড়াই হয়ে থাকেনি; এটি পরিণত হয়েছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচে। দুই দল মিলে করেছে ১০ গোল, যা তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্স পশ্চিম জার্মানিকে ৬–৩ গোলে হারিয়ে যে রেকর্ড গড়েছিল, ৬৮ বছর পর সেটিও ভেঙে গেল।
সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হৃদয়ভাঙা পরাজয়ের পর ইংল্যান্ড কেমন ঘুরে দাঁড়াবে, তা নিয়ে ম্যাচের আগে অনেক প্রশ্ন ছিল। কিন্তু টমাস টুখেলের দল শুরু থেকেই দেখিয়ে দেয়, হতাশা তারা মাঠেই ফেলে এসেছে। ম্যাচের মাত্র তৃতীয় মিনিটে ইংল্যান্ড এগিয়ে যায়। মাঝমাঠ থেকে দ্রুত আক্রমণ গড়ে তুলে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করেন ইংলিশ ফুটবলাররা। শেষ পর্যন্ত অধিনায়ক ডেকলান রাইস বল জালে জড়িয়ে দলকে কাঙ্ক্ষিত সূচনা এনে দেন।
শুরুর ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই দ্বিতীয় আঘাত হানে ইংল্যান্ড। ১৮তম মিনিটে কর্নার থেকে আসা আক্রমণে ডিফেন্ডার এজরি কনসা গোল করে ব্যবধান ২–০ করেন। ফ্রান্সের রক্ষণভাগ তখন পুরোপুরি দিশেহারা। দিদিয়ে দেশমের দলের খেলোয়াড়রা বলের দখল রাখলেও ইংল্যান্ডের দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ সামলাতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলেন।
প্রথমার্ধের শেষভাগ ছিল পুরোপুরি বুকায়ো সাকার। ৩৭তম মিনিটে দুর্দান্ত এক আক্রমণ থেকে গোল করে ব্যবধান ৩–০ করেন আর্সেনালের এই উইঙ্গার। যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে আবারও ফ্রান্সের রক্ষণ ভেঙে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। মাত্র ৪৫ মিনিটেই স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৪–০। প্রথমার্ধের এই বিধ্বংসী পারফরম্যান্সে ম্যাচ প্রায় একতরফা হয়ে গেছে বলেই মনে হচ্ছিল।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফ্রান্সের জন্য এমন প্রথমার্ধ খুবই বিরল। ১৯৩০ সালের পর কোনো ম্যাচের প্রথমার্ধে চার গোল হজম করেনি ‘লে ব্লু’রা। প্রতিরক্ষায় একের পর এক ভুল, মাঝমাঠে সমন্বয়ের অভাব এবং ইংল্যান্ডের দ্রুতগতির আক্রমণের সামনে ফরাসিরা পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়ে। বিদায়ী কোচ দিদিয়ে দেশমের জন্য এমন প্রথমার্ধ নিঃসন্দেহে ছিল দুঃস্বপ্নের মতো।
প্রথমার্ধের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা ছিলেন বুকায়ো সাকা। দ্বিতীয়ার্ধে আরও একটি গোল করে তিনি হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন এবং বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে হ্যাটট্রিক করা মাত্র দ্বিতীয় ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান। এর আগে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জিওফ হার্স্ট এই কীর্তি গড়েছিলেন। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করা ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলারও হয়ে যান সাকা; প্রথমজন ছিলেন ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলে, যিনি ১৯৫৮ সালের সেমিফাইনালে এই কীর্তি গড়েছিলেন।
প্রথমার্ধ শেষে স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকদের অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, ইংল্যান্ড সহজ জয় নিয়েই মাঠ ছাড়বে। কিন্তু বিরতির পর ম্যাচ যে আরও নাটকীয় হয়ে উঠবে, সেটি তখনও কেউ কল্পনা করতে পারেননি। দিদিয়ে দেশম একসঙ্গে একাধিক পরিবর্তন এনে দলের আক্রমণে নতুন গতি যোগ করেন। আর সেই পরিবর্তনের ফল মিলতে খুব বেশি সময় লাগেনি।
বিরতির সময় ড্রেসিংরুমে কী ঘটেছিল, সেটি বাইরে প্রকাশ করা হয়নি। তবে মাঠে ফিরে ফ্রান্সের ফুটবলারদের শরীরী ভাষাই বলে দিচ্ছিল, দিদিয়ে দেশম তাদের কঠোর বার্তা দিয়েছেন। প্রথমার্ধে অসহায় আত্মসমর্পণ করা দলটি দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে মাঠে নামে। বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নিয়ে ইংল্যান্ডের রক্ষণে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে তারা। আর সেই চাপের ফলও দ্রুত পেয়ে যায় ফরাসিরা।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই কিলিয়ান এমবাপ্পে ছিলেন সবচেয়ে সক্রিয়। তার গতি ও ড্রিবলিং ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ৫৫তম মিনিটে ব্যবধান কমান এই ফরাসি অধিনায়ক। গোলটি শুধু ম্যাচে ফ্রান্সকে ফেরানোর আশা জাগায়নি, ব্যক্তিগতভাবেও বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন একটি মাইলফলক গড়ে দেন এমবাপ্পে। এরপর ব্র্যাডলি বারকোলা আরেকটি গোল করলে স্কোর দাঁড়ায় ৪–২। হঠাৎ করেই ম্যাচে ফিরে আসে উত্তেজনা।
চার গোলের লিড পাওয়ার পর কিছুটা রক্ষণাত্মক হয়ে পড়েছিল ইংল্যান্ড। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে ফ্রান্স। একের পর এক আক্রমণে গোলের সুযোগ তৈরি হতে থাকে। ইংল্যান্ডের গোলরক্ষককে কয়েকবার গুরুত্বপূর্ণ সেভও করতে হয়। ম্যাচের গতি তখন পুরোপুরি বদলে গেছে। প্রথমার্ধে যে ইংল্যান্ড আধিপত্য দেখিয়েছিল, দ্বিতীয়ার্ধে সেই একই চিত্র দেখা যায় ফ্রান্সের খেলায়।
৬৮তম মিনিটে আবারও গোল করেন এমবাপ্পে। নিজের দ্বিতীয় গোল করার পাশাপাশি বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত গোলসংখ্যা ২২-এ নিয়ে যান তিনি। এর মাধ্যমে লিওনেল মেসিকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকার শীর্ষে উঠে আসেন ফরাসি এই সুপারস্টার। গোলটি ফ্রান্সকে ম্যাচে পুরোপুরি ফিরিয়ে আনে এবং স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৪–৩। তখন মনে হচ্ছিল, চার গোল পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্ব।
ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের ওপর চাপ বাড়তেই থাকে। ফ্রান্স আরও কয়েকটি স্পষ্ট গোলের সুযোগ তৈরি করলেও সেগুলো কাজে লাগাতে পারেনি। সেই ব্যর্থতার মূল্যও দিতে হয় তাদের।
ম্যাচের ৮৭তম মিনিটে ইংল্যান্ডের হয়ে আক্রমণে ওঠেন ডিজেড স্পেন্স। ফ্রান্সের ডিফেন্ডার মালো গুস্তো তাকে ফাউল করলে পেনাল্টির বাঁশি দেন রেফারি। স্পটকিক নিতে এসে কোনো ভুল করেননি বুকায়ো সাকা। ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন তিনি এবং ইংল্যান্ডকে আবারও দুই গোলের স্বস্তিদায়ক ব্যবধান এনে দেন। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে হ্যাটট্রিক করা মাত্র দ্বিতীয় ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে নিজের নাম লেখান ইতিহাসে। এর আগে ১৯৬৬ সালের ফাইনালে জিওফ হার্স্ট এই কীর্তি গড়েছিলেন।
তবে নাটক তখনও শেষ হয়নি। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে দারুণ এক বাঁকানো শটে গোল করেন উসমান দেম্বেলে। স্কোর হয়ে যায় ৫–৪। শেষ কয়েক মিনিটে ফ্রান্স সমতাসূচক গোলের জন্য সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগও তখন চরম পরীক্ষার মুখে।
কিন্তু ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে সব অনিশ্চয়তার অবসান ঘটান জুড বেলিংহাম। ৯৮তম মিনিটে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে একাধিক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে গোল করেন তিনি। সেই গোলেই ৬–৪ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে ইংল্যান্ড। পুরো স্টেডিয়াম তখন ইংলিশ সমর্থকদের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে।
এই ম্যাচে একাধিক ইতিহাসও গড়েছে ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এটিই পুরুষদের বিশ্বকাপে তাদের সর্বোচ্চ অবস্থান। পাশাপাশি দেশের বাইরে অনুষ্ঠিত কোনো বিশ্বকাপে এটিই ইংল্যান্ডের সেরা ফল। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড হলো, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে নিজেদের চেয়ে এগিয়ে থাকা কোনো দলকে বিশ্বকাপে হারানোর ঘটনা ২০০২ সালে আর্জেন্টিনাকে হারানোর পর এবারই প্রথম।
অন্যদিকে ফ্রান্সের জন্য এটি ছিল এক তিক্ত পরিসংখ্যানের ম্যাচ। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এই প্রথম তারা এক ম্যাচে ছয় গোল হজম করল। শুধু বিশ্বকাপ নয়, ৬৬ বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক কোনো ম্যাচেও এতগুলো গোল হজম করতে হয়নি ফরাসিদের। বিদায়ী কোচ দিদিয়ে দেশমের শেষ ম্যাচটি তাই স্মরণীয় হয়ে থাকলেও সেটি সুখকর স্মৃতি হয়ে থাকল না।
ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও আলো ছড়িয়েছেন জুড বেলিংহাম। পুরো টুর্নামেন্টে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় সাতটি, যা একটি বিশ্বকাপ আসরে কোনো ইংলিশ ফুটবলারের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড।
ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেছেন সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষকেরা। বিবিসির ম্যাচ অব দ্য ডে অনুষ্ঠানে সাবেক ডিফেন্ডার স্টিফেন ওয়ারনক বলেন, “পুরো টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে মুক্ত ও আক্রমণাত্মক ফুটবল আজই দেখা গেল।” সাবেক মিডফিল্ডার ড্যানি মারফির মতে, “এই ম্যাচে এমন সব ফুটবল দেখা গেছে, যা অনেক দিন মনে থাকবে। আক্রমণ, গতি, নাটকীয়তা-সবকিছুই ছিল।”
বিশ্বকাপের শিরোপা জিততে না পারলেও ব্রোঞ্জ জয়ের মাধ্যমে ইংল্যান্ড নিজেদের সামর্থ্যের শক্ত বার্তা দিয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত পরাজিত হলেও দ্বিতীয়ার্ধের লড়াকু মানসিকতা দেখিয়ে প্রমাণ করেছে, তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ম্যাচে ফিরে আসার বিশ্বাস কখনও হারায়নি। তবে শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে হাসি ফুটেছে ইংল্যান্ডের মুখেই।