গাইবান্ধার রাম মূর্তি নির্মাণের মূল উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র অর্থ পাচার মামলায় গ্রেপ্তার

গাইবান্ধার রাম মূর্তি নির্মাণের মূল উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র অর্থ পাচার মামলায় গ্রেপ্তার
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

দেশজুড়ে আলোচিত গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার ৮১ ফুট রামমূর্তি নির্মাণের মূল উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরুণী দাস (৩৬)কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। রাজধানীর উত্তরা (পশ্চিম) থানায় দায়ের করা একটি মানি লন্ডারিং মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

রোববার (১২ জুলাই) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ কালি মন্দির এলাকা থেকে সিআইডির একটি দল তাকে আটক করে।

 

গ্রেপ্তার হওয়া হরিদাস চন্দ্র তরুণী দাস উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের গোপীনাথ চন্দ্র দাসের ছেলে। তিনি শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ কালি মন্দিরের আধুনিকায়ন এবং মন্দির চত্বরে ৮১ ফুট উচ্চতার রামমূর্তি নির্মাণ প্রকল্পের প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত।

 

সোমবার (১৩ জুলাই) পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরোয়ার আলম খান গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ঢাকার উত্তরা (পশ্চিম) থানায় দায়ের করা একটি মানি লন্ডারিং মামলায় সিআইডি তাকে গ্রেপ্তার করেছে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

 

ওসি আরও জানান, গ্রেপ্তারের পর মন্দির এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

 

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হরিদাস চন্দ্র অভাবের সংসারে পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে চতুর্থ সন্তান। স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর তিনি ভারতে চলে যান। দীর্ঘদিন সেখানে অবস্থানের পর ২০২৪ সালে নিজ এলাকায় ফিরে আসেন।

 

এলাকায় ফিরে তিনি গ্রামের পুরোনো কালি মন্দিরের অবকাঠামো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন। এ লক্ষ্যে স্থানীয়দের নিয়ে বৈঠক করে একটি মন্দির পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে হরিদাস চন্দ্রকে সভাপতি এবং বিপিন চন্দ্র দাসকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

 

২০২৫ সালের মে মাসে মন্দির সংস্কারের কাজ শুরু হয়। পরে মন্দিরের নাম পরিবর্তন করে ‘শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ কালি মন্দির’ রাখা হয়। এর কিছুদিন পর মন্দির চত্বরে ৮১ ফুট উচ্চতার রামমূর্তি নির্মাণের কাজ শুরু হলে বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

 

বিশেষ করে এত বড় প্রকল্পে অর্থায়নের উৎস নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। এরপর রামমূর্তি অপসারণ, নির্মাণকাজ বন্ধ এবং অর্থের উৎস তদন্তের দাবিতে পলাশবাড়ী, গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

 

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এটি হরিদাস চন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা নয়। এর আগে ২০২২ সালের ৭ নভেম্বর জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও র‍্যাবের যৌথ অভিযানে রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

 

সে সময় অভিযোগ ছিল, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের একজন প্রটোকল কর্মকর্তার ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে বদলি বাণিজ্য, টেন্ডারে প্রভাব বিস্তার এবং প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

 

তৎকালীন র‍্যাবের এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছিল, ভারতে অবস্থানকালে তিনি আত্মীয়ের সহযোগিতায় একটি এতিম সনদ সংগ্রহ করেন এবং সেখানে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে ২০১০ সালে বাংলাদেশে ফিরে উত্তরা এলাকায় পুরোনো এসি কেনাবেচা ও মেরামতের ব্যবসা শুরু করেন।

 

র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বিয়ের আগে তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে ‘তাওহীদ ইসলাম’ নাম গ্রহণ করেন। এরপর ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া এলাকায় জমি কেনেন এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ ওঠে।

 

তবে বর্তমান গ্রেপ্তারের বিষয়ে সিআইডি এখনো বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দেয়নি। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানি লন্ডারিং মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে তার আর্থিক লেনদেন, সম্পদের উৎস এবং রামমূর্তি নির্মাণে ব্যবহৃত অর্থের বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হতে পারে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।


সম্পর্কিত নিউজ