পাহাড়ি ঢলে সেতু ধসে রাঙামাটি-বান্দরবান সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

পাহাড়ি ঢলে সেতু ধসে রাঙামাটি-বান্দরবান সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রবল পানির চাপে বান্দরবান–রাঙামাটি সড়কের গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজঘাট সেতুর একটি অংশ ধসে পড়েছে। ফলে দুই জেলার মধ্যে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। একই সময়ে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের সুখবিলাস দুধপুকুরিয়া এলাকার রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েকদিন ধরে টানা ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি ছড়া, নদী ও খালের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। উজান থেকে নেমে আসা ঢলের প্রবল চাপ রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ সহ্য করতে না পারায় সেটি ধসে যায়। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে পড়ে। অনেক বসতঘর, দোকানপাট, কৃষিজমি, মাছের ঘের এবং স্থানীয় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়।

 

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা এবং পার্শ্ববর্তী রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার কয়েকটি গ্রাম। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে উঁচু স্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। কোথাও কোথাও রান্নার চুলা পর্যন্ত পানির নিচে চলে যাওয়ায় খাদ্যসংকটের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

 

এদিকে পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে বান্দরবান–রাঙামাটি সড়কের ব্রিজঘাট সেতুর একটি বড় অংশ ধসে পড়ায় ওই সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে রাঙামাটি জেলার সঙ্গে বান্দরবানের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জরুরি রোগী পরিবহন, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা এলেই পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে এই অঞ্চলে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রতিবছর সড়ক, সেতু ও বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলছে না।

 

রাজস্থলী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. সুমন বলেন, রাতভর বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে হঠাৎ করেই বাঁধ ভেঙে যায়। সকালে উঠে চারদিকে শুধু পানি দেখা গেছে। অনেক ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে, কৃষিজমি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া।

 

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলী আকবর বলেন, ব্রিজঘাট সেতু ভেঙে যাওয়ার কারণে রাঙামাটি ও বান্দরবানের মধ্যে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। রোগী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। দ্রুত বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু না হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

 

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। কাঁচাবাজারে সবজি, মাছ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে স্থানীয় বাজারে পণ্যের দামও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

 

প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে সংশ্লিষ্ট দপ্তর কাজ শুরু করেছে। একই সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি সহায়তা ও পুনর্বাসনের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

বান্দরবান সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফা সুলতানা খান হীরামনি বলেন, "আমি নিজেও পরিবার নিয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছি। ব্রিজঘাট সেতুর ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।"

 

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা এখনো অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও নতুন করে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রও জানিয়েছে, পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে অঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

 

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনে পাহাড়ি এলাকায় চলাচল না করা, নদী ও ছড়ার কাছাকাছি অবস্থান এড়িয়ে চলা এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সেতু ও বাঁধ দ্রুত সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ভোগ থেকে মানুষকে রক্ষা করা যায়।


সম্পর্কিত নিউজ