নাম নিয়ে বিতর্কে শ্রদ্ধার ‘ঈথা’, মুক্তির আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু

নাম নিয়ে বিতর্কে শ্রদ্ধার ‘ঈথা’, মুক্তির আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বলিউড অভিনেত্রী শ্রদ্ধা কাপুর অভিনীত বহুল প্রতীক্ষিত জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ঈথা’ মুক্তির আগেই বিতর্কের মুখে পড়েছে। মহারাষ্ট্রের কিংবদন্তি তামাশা ও লাবণী শিল্পী বিথাবাই নারায়ণগাঁওকরের জীবন অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটি নিয়ে শুরু থেকেই দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। তবে টিজার প্রকাশের পর সিনেমার নাম নিয়েই দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক।

ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি প্রকাশিত টিজারে শ্রদ্ধা কাপুরের নতুন লুক এবং লাবণী নৃত্যশিল্পীর রূপ দর্শকদের প্রশংসা কুড়ালেও মহারাষ্ট্রের ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি) চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি বিভাগ এবং বিথাবাইয়ের পরিবারের সদস্যরা ছবিটির নাম পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন।

 

এনসিপির মহারাষ্ট্র শাখার চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান বাবাসাহেব পাতিলের দাবি, বিথাবাই শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি মহারাষ্ট্রের লোকসংস্কৃতির অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি। তামাশা ও লাবণী শিল্পকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তার অবদান অসামান্য। তাই তার জীবনভিত্তিক সিনেমার নামও তার নাম অনুসারেই হওয়া উচিত বলে মনে করছেন তারা।

 

একই দাবি জানিয়েছেন বিথাবাইয়ের পরিবারের সদস্যরাও। তার দুই ছেলে কৈলাশ নারায়ণগাঁওকর ও রাজেশ নারায়ণগাঁওকর এবং নাতি মোহিত নারায়ণগাঁওকরের বক্তব্য, ‘ঈথা’ নামটি বিথাবাইয়ের পরিচয় ও অবদানকে যথাযথভাবে তুলে ধরে না। তাদের মতে, সিনেমাটির নাম ‘বিথাবাই’ রাখা হলে সেটিই হবে শিল্পীর প্রতি প্রকৃত সম্মান।

 

কে ছিলেন বিথাবাই?

বিথাবাই নারায়ণগাঁওকর মহারাষ্ট্রের তামাশা ও লাবণী শিল্পের সবচেয়ে বড় নামগুলোর একটি। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিনি এই লোকশিল্পকে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলেন।

 

তামাশা মূলত মহারাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য, যেখানে গান, নাচ, নাট্যাভিনয় এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের সংমিশ্রণ দেখা যায়। লাবণী এই তামাশা শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্রুত তালের গান ও নৃত্যভঙ্গির জন্য লাবণী ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় লোকনৃত্য হিসেবে পরিচিত।

 

বিথাবাই তার অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৫৭ এবং ১৯৯০ সালে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে সংগীত নাটক আকাদেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকেও তিনি সম্মাননা পেয়েছিলেন। তবে জীবনের শেষদিকে আর্থিক সংকট, শারীরিক অসুস্থতা এবং সামাজিক অবহেলার মধ্যেও শিল্পচর্চা চালিয়ে গেছেন তিনি।

 

টিজারের আলোচিত দৃশ্য

সিনেমার টিজারে বিথাবাইয়ের জীবনের একটি বহুল আলোচিত ঘটনাকে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, গর্ভবতী অবস্থায় মঞ্চে নাচের সময় তার প্রসববেদনা শুরু হয়। এরপর সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তিনি আবার মঞ্চে ফিরে এসে নৃত্য পরিবেশন করেন।

 

এই দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ এটিকে একজন শিল্পীর অদম্য মানসিক শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বাস্তব ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করার অভিযোগ তুলেছেন।

 

পরিবারের সদস্যদের দাবি, বাস্তবে ওই সময় দর্শকেরা অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং তাকে বিশ্রামের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তবে নির্মাতারা বলছেন, দৃশ্যটি প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে শিল্পের প্রতি বিথাবাইয়ের নিবেদন তুলে ধরা হয়েছে।

 

শ্রদ্ধা কাপুরের নতুন চ্যালেঞ্জ

‘স্ত্রী’ এবং ‘আশিকি টু’-এর মতো সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়া শ্রদ্ধা কাপুরের ক্যারিয়ারে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

জানা গেছে, এই চরিত্রের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে লাবণী নৃত্যের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। মহারাষ্ট্রের স্থানীয় শিল্পীদের কাছ থেকেও প্রশিক্ষণ নেওয়া হয়েছে। ভাষা, উচ্চারণ, শরীরী ভঙ্গি এবং মঞ্চে উপস্থিতির বিষয়েও আলাদা প্রস্তুতি নিয়েছেন অভিনেত্রী।টিজার প্রকাশের পর অনেক দর্শক মনে করছেন, এটি শ্রদ্ধা কাপুরের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং চরিত্র হতে পারে।

 

বড় তারকাদের উপস্থিতি

সিনেমাটিতে শ্রদ্ধা কাপুরের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন রণদীপ হুদা এবং মোহাম্মদ জিশান আইয়ুব। রণদীপের চরিত্র নিয়ে এখনো বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবে নির্মাতারা জানিয়েছেন, ছবিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক চরিত্র দেখা যাবে।

 

সিনেমাটি প্রযোজনা করছে ম্যাডক ফিল্মস। প্রতিষ্ঠানটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক সফল সিনেমা উপহার দিয়েছে। ফলে এই ছবি নিয়েও দর্শকদের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

 

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিনেমা?

ভারতীয় মূলধারার সিনেমায় লোকশিল্পীদের জীবন নিয়ে বড় বাজেটের চলচ্চিত্র খুব কম নির্মিত হয়। সেই জায়গা থেকে ‘ঈথা’ শুধু একটি বায়োপিক নয়, বরং মহারাষ্ট্রের লোকসংস্কৃতি, তামাশা এবং লাবণী শিল্পকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি বড় প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

 

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, সিনেমাটি সফল হলে আঞ্চলিক লোকশিল্প নিয়ে আরও বড় পরিসরে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হতে পারে।

 

নাম পরিবর্তন হবে কি?

বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ছবিটির নাম পরিবর্তন করা হবে কি না। মুক্তির আর বেশি সময় বাকি নেই। ফলে এখন নাম পরিবর্তন করা হলে নতুন করে প্রচারণা, পোস্টার, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ করতে হবে। অন্যদিকে নাম অপরিবর্তিত থাকলে বিথাবাইয়ের পরিবার ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর বিরোধিতা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

 

এ বিষয়ে এখনো পরিচালক লক্ষ্মণ উতেকর কিংবা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ম্যাডক ফিল্মস আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।

 

আগামী ২৮ আগস্ট মুক্তির অপেক্ষায় থাকা ‘ঈথা’ এখন শুধু একটি সিনেমা নয়, বরং সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং পরিচয়ের প্রশ্নেও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। শ্রদ্ধা কাপুরের অভিনয়, বিথাবাইয়ের জীবনগাথা এবং নাম বিতর্ক-সব মিলিয়ে ছবিটি মুক্তির আগেই বলিউডের অন্যতম আলোচিত প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ