চীন-পাকিস্তানের ১২২ কোটি ডলারের চুক্তি

চীন-পাকিস্তানের ১২২ কোটি ডলারের চুক্তি
ছবির ক্যাপশান, ছবি : সংগৃহীত

চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, ওষুধ শিল্প, কৃষি ও স্মার্ট প্রযুক্তি খাতে ১২২ কোটি ডলারের সহযোগিতা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের চীন সফরকালে হাংঝৌ শহরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান-চীন বিজনেস কনফারেন্সে এসব চুক্তি সই হয়। চুক্তি সইয়ের সময় শেহবাজ শরীফ ও চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের গভর্নর লিউ জিয়ে উপস্থিত ছিলেন।

আরব নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান ও চীনা কোম্পানিগুলোর মধ্যে সই হওয়া এসব চুক্তি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ইলেকট্রিক ভেহিকল বা বৈদ্যুতিক যান, ফার্মাসিউটিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি এবং স্মার্ট প্রযুক্তি খাতকে কেন্দ্র করে। পাকিস্তান সরকার আশা করছে, এই বিনিয়োগ দেশটির শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানে নতুন গতি আনবে।

 

চার দিনের সরকারি সফরে চীনে যান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ। সফরের শুরুতে হাংঝৌতে তিনি পাকিস্তান-চীন বিজনেস-টু-বিজনেস ইনভেস্টমেন্ট কনফারেন্সে অংশ নেন। ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্মেলনটি চার্জিং অবকাঠামো, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ, সৌর প্রযুক্তি এবং ওষুধ শিল্পকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয়। সেখানে শেহবাজ শরীফ কৃষি, আইটি, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং খনিজ সম্পদ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন।

 

রয়টার্স জানিয়েছে, শেহবাজ শরীফ সম্মেলনে চীনের কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এর মধ্যে ছিল শেং হুও নেং ইউয়ান কে জি, ব্যাটারি নির্মাতা সিএটিএল, স্টারচার্জ এবং শিউজেং ফার্মাসিউটিক্যাল গ্রুপ। এসব বৈঠকের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের জ্বালানি রূপান্তর, বৈদ্যুতিক যানবাহনের অবকাঠামো, ব্যাটারি স্টোরেজ, ওষুধ উৎপাদন ও প্রযুক্তি খাতে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।

 

বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকেও দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদারের অঙ্গীকার করা হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শি জিনপিং পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ককে “অবিচ্ছেদ্য” ও “সর্বমৌসুমি কৌশলগত অংশীদারিত্ব” হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যেমনই হোক, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ককে চীন সবসময় গুরুত্ব দেবে। শেহবাজ শরীফও চীন ও পাকিস্তানকে “আয়রন ব্রাদার” বা অটুট বন্ধু হিসেবে অভিহিত করেন।

 

বৈঠকে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর-সিপেকের দ্বিতীয় ধাপ নিয়েও আলোচনা হয়। রয়টার্স জানিয়েছে, দুই দেশ সিপেকের উচ্চমানের উন্নয়ন, গোয়াদর বন্দরকে আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, খুনজেরাব পাস ও কারাকোরাম মহাসড়ক উন্নয়ন এবং তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

 

সিপেক পাকিস্তানের অবকাঠামো, জ্বালানি ও বাণিজ্য সংযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। তবে গত কয়েক বছরে নিরাপত্তা ঝুঁকি, ঋণচাপ, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং চীনা নাগরিকদের ওপর হামলার কারণে প্রকল্পটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এই সফরে পাকিস্তান চীনা নাগরিক, প্রকল্প ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা জোরদারের আশ্বাস দিয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ঠেকাতে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও বলেছে।

 

চীন-পাকিস্তান বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য সংকটও আলোচনায় আসে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। রয়টার্স জানিয়েছে, শি জিনপিং পাকিস্তানের সাম্প্রতিক শান্তি প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা প্রশমনে ইসলামাবাদের ভূমিকা উল্লেখ করেন। চীন নিজেও ইরানের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও হরমুজ প্রণালির নিরাপদ নৌচলাচলকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

 

এই সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, কৃষি, জলবায়ু, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতেও একাধিক সহযোগিতা চুক্তি হয়েছে বলে আরব নিউজ জানিয়েছে। কৃষি উন্নয়ন ও প্রাণিসম্পদ খাতে ভ্যাকসিন সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে, যা পাকিস্তানের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির আধুনিকায়নে সহায়ক হতে পারে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের জন্য এই চুক্তিগুলো অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, জ্বালানি সংকট, শিল্প বিনিয়োগের ধীরগতি ও কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্যাটারি স্টোরেজে চীনা বিনিয়োগ এলে পাকিস্তানের বিদ্যুৎ খাতে আমদানি নির্ভরতা কমতে পারে। ইলেকট্রিক ভেহিকল ও চার্জিং অবকাঠামো গড়ে উঠলে পরিবহন খাতেও দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তন আসতে পারে।

 

ওষুধ শিল্পে সহযোগিতা পাকিস্তানের উৎপাদন সক্ষমতা ও রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে স্মার্ট প্রযুক্তি ও কৃষি আধুনিকায়ন পাকিস্তানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব চুক্তি কত দ্রুত বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, নীতি স্থিতিশীলতা এবং দুই দেশের বেসরকারি খাতের কার্যকর অংশগ্রহণের ওপর।


সম্পর্কিত নিউজ