ট্রাম্পের ৩৯ দেশের অভিবাসনবিরোধী নীতি বাতিল করল মার্কিন আদালত

ট্রাম্পের ৩৯ দেশের অভিবাসনবিরোধী নীতি বাতিল করল মার্কিন আদালত
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিষয়ক কঠোর নীতির বিরুদ্ধে বড় ধরনের রায় দিয়েছেন একটি ফেডারেল আদালত। দেশটির একটি আদালত ৩৯টি দেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক আশ্রয়, ওয়ার্ক পারমিট, গ্রিন কার্ড ও নাগরিকত্বসংক্রান্ত আবেদন অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলিয়ে রাখার নীতিকে বেআইনি ঘোষণা করে তা বাতিল করেছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তায় থাকা হাজার হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীর জন্য নতুন আশার দ্বার খুলে গেল।

শুক্রবার রোড আইল্যান্ডের প্রভিডেন্সে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে প্রধান মার্কিন জেলা বিচারক জন ম্যাককনেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) আইনের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে এমন নীতি গ্রহণ করেছে, যার কোনো বৈধ আইনি ভিত্তি ছিল না। এর ফলে আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশের নাগরিক দীর্ঘ সময় ধরে আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান।

 

রায়ে বিচারক উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস অভিবাসন আবেদন নিষ্পত্তির জন্য যে কাঠামো ও প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে, সংশ্লিষ্ট সংস্থা তা অনুসরণ করেনি। বরং আবেদনকারীদের জন্মস্থান ও জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে তাদের আবেদন কার্যত স্থগিত করে রাখা হয়েছিল। আদালতের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারই নয়, বরং বৈষম্যমূলক আচরণেরও শামিল।

 

বিচারক ম্যাককনেল আরও বলেন, আবেদনকারীরা আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করেও মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়েছেন। অথচ তাদের আবেদনের অগ্রগতি আটকে থাকার জন্য তারা ব্যক্তিগতভাবে দায়ী ছিলেন না। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিক হওয়ার কারণেই তারা এই জটিলতার শিকার হয়েছেন।

 

চলতি বছরের মার্চে অভিবাসী অধিকারবিষয়ক একাধিক সংগঠন, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং শ্রমিক ইউনিয়ন যৌথভাবে এই নীতির বিরুদ্ধে মামলা করে। তাদের অভিযোগ ছিল, ট্রাম্প প্রশাসন নিরাপত্তার অজুহাতে বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে।

 

বাদীপক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী আইনি সংগঠন ডেমোক্রেসি ফরওয়ার্ডের প্রধান নির্বাহী স্কাই পেরিমান আদালতের রায়কে আইনের শাসনের বিজয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, এই রায় স্পষ্ট করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কোনো বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া নির্বিচারে বন্ধ করে দিতে পারে না এবং নাগরিকত্ব বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে মানুষের সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করারও সুযোগ নেই।

 

মূলত ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল গার্ডের দুই সদস্যের ওপর হামলার ঘটনার পর ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন ইস্যুতে আরও কঠোর অবস্থান নেয়। সরকারি কৌঁসুলিদের দাবি ছিল, ওই হামলার সঙ্গে একজন আফগান বংশোদ্ভূত অভিবাসীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। যদিও অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

 

ওই ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিবাসন ব্যবস্থাকে ‘পুনর্গঠন’ করার ঘোষণা দেন। এরপর ধাপে ধাপে আফগানিস্তান, ইরান, সিরিয়া, সোমালিয়া, হাইতি, ভেনিজুয়েলাসহ মোট ৩৯টি দেশের নাগরিকদের ওপর বিভিন্ন মাত্রার ভ্রমণ ও অভিবাসনসংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। প্রশাসনের যুক্তি ছিল, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করা এবং আবেদনকারীদের আরও কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

 

তবে সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপ কার্যত নির্দিষ্ট অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছিল, এই নীতির ফলে যুদ্ধ, রাজনৈতিক নিপীড়ন বা মানবিক সংকট থেকে পালিয়ে আসা বহু মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের সুযোগ হারাচ্ছেন।

 

সাম্প্রতিক রায়কে অভিবাসন অধিকারকর্মীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, আদালতের সিদ্ধান্ত শুধু হাজার হাজার আবেদনকারীর জন্য স্বস্তি নিয়ে আসেনি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় আইনের শাসন ও সমঅধিকারের নীতিকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেছে।

 

তবে বিষয়টি এখানেই শেষ হচ্ছে না। আইনি বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প প্রশাসন এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারে। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু আপাতত আদালতের এই সিদ্ধান্তকে অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় বিজয় এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির ওপর একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।


সম্পর্কিত নিউজ