আন্তর্জাতিক বাজারে কমেছে জ্বালানি তেলের দাম

আন্তর্জাতিক বাজারে কমেছে জ্বালানি তেলের দাম

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের নতুন ইঙ্গিত মিলতেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তির আবহ দেখা গেছে। ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধবিরতি শুধু সীমান্ত সংঘাত কমানোর উদ্যোগ নয়; বরং এটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের পথও খুলে দিতে পারে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পরিস্থিতি ইতিবাচক দিকে এগোলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌচলাচল নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বিদ্যমান চাপও কমতে পারে।

 

বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা ২৯ মিনিটের দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের ফিউচার মূল্য ৭৭ সেন্ট বা ০.৮ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৯৭ দশমিক ০৩ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ৭০ সেন্ট বা ০.৭ শতাংশ কমে দাঁড়ায় প্রতি ব্যারেল ৯৫ দশমিক ৩২ ডলারে। তবে বাজারে এখনও সতর্কতা পুরোপুরি কাটেনি। ফলে দাম কমলেও তা সীমিত পরিসরের মধ্যেই আটকে রয়েছে। অনেক বিনিয়োগকারী এখনও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

 

এর মাত্র একদিন আগেই পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া, কুয়েতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং হরমুজ প্রণালির কাছে মার্কিন সামরিক অভিযানের খবরে বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে যায়।

 

তবে বুধবার গভীর রাতে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সংঘাত বন্ধে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ঘোষণা বাজারে নতুন বার্তা দেয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই চুক্তি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও গতিশীল করতে পারে। কারণ শুরু থেকেই ইরান লেবাননে সংঘাত বন্ধকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সমঝোতার অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে তুলে ধরেছিল।

 

পিভিএম অয়েলের বিশ্লেষক জন ইভান্স বলেন, “ইরান দীর্ঘদিন ধরে লেবানন ও হিজবুল্লাহকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিল। যুদ্ধবিরতি সেই অচলাবস্থা কাটানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।” একই দিনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ এখনও অব্যাহত রয়েছে। যদিও বড় ধরনের অগ্রগতি হয়নি, তবুও উভয় পক্ষ পরস্পরের প্রস্তাব ও আলোচনার খসড়া পর্যালোচনা করছে। এদিকে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানকে ঘিরে চলমান আলোচনায় সপ্তাহান্তের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যেতে পারে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও একই দিনে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা ঘটে। রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এককভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করতে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করে। যদিও এটি কার্যকর হওয়ার জন্য সিনেটের অনুমোদন এবং সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট ভেটো অতিক্রমের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এখনও বাকি রয়েছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা কমলে বিশ্ব অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে জ্বালানি খাতে। কারণ বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো সংঘাত সরাসরি তেলের বাজারকে প্রভাবিত করে।

 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ) জানিয়েছে, ২৯ মে শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত ৮০ লাখ ব্যারেল কমে ৪৩৩ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে। অথচ বিশ্লেষকেরা মজুত কমার পরিমাণ প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল হবে বলে ধারণা করেছিলেন। প্রত্যাশার তুলনায় দ্বিগুণ হারে মজুত কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সময়ে বৈশ্বিক চাহিদা কিছুটা দুর্বল থাকায় চীনা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ইরানি তেলের বিক্রেতারা মূল্যছাড় বাড়িয়েছে। এপ্রিলের পর এই প্রথম উল্লেখযোগ্য ছাড় দেখা গেছে, যার প্রভাব রুশ তেলের প্রিমিয়াম মূল্যের ওপরও পড়েছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনৈতিক অগ্রগতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ওপরই আগামী কয়েক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের গতিপথ নির্ভর করবে। তবে আপাতত যুদ্ধবিরতির খবর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়েছে এবং বাজারকে কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ