{{ news.section.title }}
২০২৫ সালে ৫৬% বেসামরিক মৃত্যুর জন্য দায়ী ইসরায়েল
বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ২০২৫ সালে বিস্ফোরক অস্ত্রের ব্যবহার হাজারো বেসামরিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। নতুন এক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর বিশ্বের অন্তত ৬৫টি দেশ ও অঞ্চলে বিস্ফোরক অস্ত্রের কারণে ২২ হাজার ৬০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৬ শতাংশ মৃত্যুর জন্য ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীকে দায়ী করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা উদ্যোগ ‘এক্সপ্লোসিভ উইপনস মনিটর’ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিস্ফোরক অস্ত্র ব্যবহারের ফলে বেসামরিক মানুষের ওপর যে মানবিক বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক উদ্বেগের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২১ শতাংশ কমেছে। গবেষকরা বলছেন, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতপূর্ণ এলাকায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক এবং বিশ্বের বহু অঞ্চলে বেসামরিক মানুষ প্রতিনিয়ত বিস্ফোরক হামলার ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিস্ফোরক অস্ত্রের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বেসামরিক নাগরিকদের বড় অংশই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছিলেন। বিমান হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত, আর্টিলারি গোলাবর্ষণ এবং অন্যান্য ভারী অস্ত্রের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণ হয়েছে। বিশেষ করে জনবহুল এলাকায় পরিচালিত বিমান হামলাগুলোতে বেসামরিক হতাহতের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
প্রতিবেদনটি বলছে, ২০২৫ সালে বেসামরিক জনগণের ক্ষতির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী ছিল রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনী। বিশ্বের ২৯টি দেশের সরকারি বাহিনী বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সংঘটিত ক্ষতিকর ঘটনার ৮৫ শতাংশের সঙ্গে জড়িত ছিল। অপরদিকে বিভিন্ন অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে কমসংখ্যক হামলার জন্য দায়ী ছিল।
গবেষণায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে নথিভুক্ত বেসামরিক মৃত্যুর বড় অংশ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সংঘটিত হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভারী বিস্ফোরক অস্ত্র ব্যবহারের ফলে বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর তালিকায় রয়েছে Democratic Republic of the Congo, Ethiopia, Iran, Iraq, Lebanon, Myanmar, Palestine, Somalia, South Sudan, Sudan, Syria, Ukraine এবং Yemen। এসব অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ, বিদ্রোহ, সীমান্ত সংঘাত এবং সামরিক অভিযানের কারণে বেসামরিক জনগণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ২০২৫ সালে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের ওপর হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ত্রাণ বিতরণ, মানবিক সহায়তা এবং জরুরি সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর ওপর ২ হাজার ৫৪১টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫২ শতাংশ বেশি। একই সময়ে স্কুলের ওপর হামলার সংখ্যা ৬৪ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৪১৬-এ পৌঁছেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, যুদ্ধক্ষেত্রে হাসপাতাল, স্কুল, ত্রাণকেন্দ্র এবং অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও মানবিক সহায়তা ব্যবস্থার ওপর এসব হামলার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব লাখো মানুষের জীবনে পড়ে।
গবেষকরা আরও সতর্ক করেছেন যে, বেসামরিক জনগণের ক্ষয়ক্ষতি ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক ঘটনা’ হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেখা যাচ্ছে। তাদের মতে, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনার সময় বেসামরিক জনগণের সুরক্ষাকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা না করলে ভবিষ্যতে মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
এক্সপ্লোসিভ উইপনস মনিটর বলছে, ২০২৫ সালে কিছু অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির কারণে হতাহতের সংখ্যা কমলেও বিশ্বজুড়ে বিস্ফোরক অস্ত্রের ব্যবহার এখনো ভয়াবহ মাত্রায় রয়েছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভারী অস্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি কমানো কঠিন হবে।
প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি নতুন করে আহ্বান জানিয়েছে, যাতে যুদ্ধক্ষেত্রে বেসামরিক জনগণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে সুরক্ষিত রাখতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। গবেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বাস্তবায়নে ব্যর্থতা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।