দিল্লিতে বিএসএফ-বিজিবি বৈঠক: যৌথ সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই শেষ, ভেতরে কী আলোচনা হলো?

দিল্লিতে বিএসএফ-বিজিবি বৈঠক: যৌথ সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই শেষ, ভেতরে কী আলোচনা হলো?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ

নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের চার দিনের বৈঠক শেষ হয়েছে। তবে এবার বৈঠক শেষে দুই বাহিনীর মহাপরিচালক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আসেননি। যৌথ আলোচনার নথিতে স্বাক্ষরের পরও সংবাদ সম্মেলন না হওয়ায় বিষয়টি সীমান্ত কূটনীতির আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, বিজিবি এবং ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স, বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক শেষ হয়। বৈঠকটি ৮ জুন শুরু হয়ে ১১ জুন পর্যন্ত চলে। বিএসএফ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দুই দেশের সীমান্ত পরিস্থিতি, নিরাপত্তা, চোরাচালান, পুশ ইন, সীমান্তে মৃত্যু এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নানা বিষয় গুরুত্ব পায়।

 

বৈঠক শেষে বিএসএফের পক্ষ থেকে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দুই বাহিনীর আলোচনা সৌহার্দ্যপূর্ণ, ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। উভয় পক্ষ বিদ্যমান সীমান্ত পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নিজেদের উদ্বেগ তুলে ধরে। সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দুই বাহিনীই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

 

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মাদক, অস্ত্র, জাল মুদ্রা, স্বর্ণসহ নিষিদ্ধ পণ্যের চোরাচালান ঠেকাতে দুই পক্ষ বিস্তারিত আলোচনা করেছে। একই সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম, মানবপাচার এবং অপরাধী চক্রের তৎপরতা প্রতিরোধের উপায় নিয়েও কথা হয়েছে। সীমান্তে মৃত্যু এবং পুশ ইন ইস্যুও আলোচনায় স্থান পায়।

 

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ের পুশ ইন অভিযোগ এবং সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। বিজিবির পক্ষ থেকে আগে বলা হয়েছিল, কোনো ব্যক্তি সত্যিই বাংলাদেশি নাগরিক হলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রত্যাবাসন হওয়া উচিত। এ ধরনের সংবেদনশীল ইস্যু নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে বৈঠকটি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

 

বৈঠকে সীমান্তে সমন্বিত টহল আরও জোরদার করার বিষয়ে দুই বাহিনী একমত হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তে সতর্কতা বৃদ্ধি, তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ প্রচেষ্টা আরও গতিশীল করার কথাও বলা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় অবৈধ কার্যকলাপ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়।

 

বিএসএফের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সীমান্ত নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন যেকোনো পদক্ষেপের ক্ষেত্রে দুই পক্ষ জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। উভয় পক্ষ বৈঠকের ফলাফল নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছে।

 

তবে বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন না হওয়া এবার আলাদা করে নজর কাড়ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ইতিহাসে এমন ঘটনা এই প্রথম বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সাধারণত বৈঠক শেষে দুই বাহিনীর প্রধানরা যৌথভাবে সংবাদমাধ্যমের সামনে আসেন এবং আলোচনার মূল বিষয়গুলো তুলে ধরেন। এবার তা না হওয়ায় সীমান্ত ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান ও সাম্প্রতিক উত্তেজনা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।

 

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এ সীমান্তে চোরাচালান, মানবপাচার, অবৈধ পারাপার, সীমান্তে মৃত্যু এবং পুশ ইন নিয়ে প্রায়ই উত্তেজনা দেখা দেয়। এসব ইস্যু সমাধানে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠককে দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

 

১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর দুই দেশের মধ্যে ডিজি পর্যায়ের সীমান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো। ১৯৯৩ সালে সিদ্ধান্ত হয়, এ বৈঠক বছরে দুবার হবে। এরপর থেকে বাংলাদেশ ও ভারত পর্যায়ক্রমে ঢাকা ও নয়াদিল্লিতে এ বৈঠকের আয়োজন করে আসছে।

 

এবারের বৈঠক শেষ হয়েছে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়ে। তবে যৌথ সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই বৈঠক শেষ হওয়া সীমান্ত কূটনীতিতে একটি নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে সামনে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, বৈঠকে হওয়া সিদ্ধান্তগুলো মাঠপর্যায়ে কত দ্রুত বাস্তবায়ন হয় এবং সীমান্তে শান্তি ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে দুই বাহিনী কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ