বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম

বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ইরানের সঙ্গে কোনো শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত না হলে দেশটির বিরুদ্ধে ‘খুব কড়া হামলা’ চালানো হবে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বুধবার (১০ জুন) আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দিনের একপর্যায়ে তীব্র ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখায়। দিনশেষে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই-উভয় ধরনের অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ ডলার পর্যন্ত বেড়ে লেনদেন শেষ হয়। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য সরবরাহ ঝুঁকির কারণে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করায় বাজারে এই উত্থান দেখা যায়।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৬৫ ডলার বা প্রায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৩ দশমিক ১০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৮৩ ডলার বা প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ০৩ ডলারে লেনদেন শেষ করে।

 

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক তেল সরবরাহে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীরা আগাম ঝুঁকি বিবেচনায় তেলের বাজারে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।

 

গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর মঙ্গলবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধরনের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা গেছে। ওই ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর মধ্যেই ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্য বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করে।

 

বুধবার দুপুরের দিকে ট্রাম্পের নতুন হামলার হুঁশিয়ারির পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক লাফে প্রায় ৩ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যায়। তবে পরে হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দেওয়া ট্রাম্পের আরেকটি বক্তব্যের পর বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসে এবং দিনের শেষে দাম আগের তুলনায় কিছুটা নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে অবস্থান করে।

 

হোয়াইট হাউজে ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে হরমুজ প্রণালী দিয়ে ১০ কোটিরও বেশি ব্যারেল তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করেছে। তাঁর মতে, এ পদক্ষেপের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি এবং বাজারে আতঙ্কও সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে।

 

তিনি আরও বলেন, বিশ্বের দৈনিক তেল চাহিদা প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল। এই বিশাল চাহিদার প্রেক্ষাপটে সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হতে পারে। ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন বাহিনীর এই অভিযানের কারণে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

 

নিজের বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, “আমরা এই পদক্ষেপ না নিলে তেলের দাম আজ ৮৫ থেকে ৯০ ডলারে থাকত না, বরং ২৫০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যেত।” যদিও তাঁর এই দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো যাচাই পাওয়া যায়নি।

 

এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেন। তিনি অভিযোগ করেন, শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা দীর্ঘায়িত করে সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়েছে তেহরান। এ জন্য ইরানকে ‘চরম মূল্য’ দিতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

 

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা যদি আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো কিংবা হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো সংঘাত শুরু হলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তার বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

 

জ্বালানি বাজার সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন। কূটনৈতিক সমাধানের কোনো অগ্রগতি না হলে তেলের বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে এবং এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ