প্রথম বিশ্বযুদ্ধকেও ছাড়িয়ে গেল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধকেও ছাড়িয়ে গেল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ
ছবির ক্যাপশান, ছবি: রয়টার্স

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করেন, তখন অনেক বিশ্লেষকই ধারণা করেছিলেন যুদ্ধটি হয়তো কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। মস্কোর লক্ষ্য ছিল দ্রুত কিয়েভের দিকে অগ্রসর হয়ে ইউক্রেনের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে চাপে ফেলা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। কিন্তু ইউক্রেনের প্রতিরোধ, পশ্চিমা সামরিক সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের বাস্তবতা সেই হিসাব পুরোপুরি বদলে দেয়।

চার বছরেরও বেশি সময় পর এসে যুদ্ধটি নতুন এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। ২০২৬ সালের ১১ জুন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের স্থায়িত্বকাল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মোট সময়সীমাকে ছাড়িয়ে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই শুরু হয়ে ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর শেষ হয়েছিল এবং এর স্থায়িত্ব ছিল ১ হাজার ৫৬৭ দিন। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন অভিযান এখন সেই সময়সীমা অতিক্রম করে ১ হাজার ৫৭০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলছে।

 

ইতিহাসবিদরা বলছেন, দুটি যুদ্ধের মধ্যে কিছু অস্বস্তিকর মিলও রয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে যেমন দ্রুত বিজয়ের প্রত্যাশা ছিল, তেমনি ২০২২ সালেও অনেকেই ভেবেছিলেন ইউক্রেন অভিযান দীর্ঘ হবে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধটি পরিণত হয়েছে ক্ষয়ক্ষতির এক দীর্ঘ লড়াইয়ে, যেখানে ট্রেঞ্চ যুদ্ধ, আর্টিলারি হামলা এবং সীমিত অগ্রগতি যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। আজকের যুদ্ধে নতুন সংযোজন হয়েছে ড্রোন প্রযুক্তি, যা সামরিক কৌশলের ধরনই বদলে দিয়েছে।

 

যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, ততই বেড়েছে মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, উভয় পক্ষের সামরিক ও বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা মিলিয়ে কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আহত, নিখোঁজ, বাস্তুচ্যুত এবং যুদ্ধ-সম্পর্কিত অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি ধরলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের লাখো মানুষ এখনো যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবের মধ্যে বসবাস করছে এবং দেশটির বহু শহর, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও শিল্পকারখানা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

বিশ্বব্যাংক, ইউরোপীয় কমিশন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ইউক্রেনের পুনর্গঠন ব্যয় এবং যুদ্ধজনিত ক্ষতির পরিমাণ কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইউক্রেন বা রাশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; জ্বালানি বাজার, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, শস্য রপ্তানি, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েছে।

 

বাংলাদেশের জন্যও এই যুদ্ধ সম্পূর্ণ দূরের কোনো ঘটনা ছিল না। উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে যাওয়া কিছু বাংলাদেশি তরুণ বিভিন্ন উপায়ে রাশিয়ায় গিয়ে পরবর্তীতে যুদ্ধক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়েন। আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। এতে যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাবের আরেকটি মানবিক দিক স্পষ্ট হয়েছে।

 

এদিকে যুদ্ধ বন্ধে একের পর এক কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি। বিভিন্ন সময়ে তুরস্ক, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা হয়েছে। কয়েকটি সীমিত যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময় কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলেও সেগুলো স্থায়ী শান্তির ভিত্তি তৈরি করতে পারেনি।

 

সম্প্রতি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়ে সুইজারল্যান্ড বা তুরস্কের মতো নিরপেক্ষ দেশে সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাব দেন। চিঠিতে তিনি যুদ্ধবিরতি এবং বর্তমান ফ্রন্টলাইনকে ভিত্তি করে আলোচনার আহ্বান জানান। প্রস্তাবটি পশ্চিমা মিত্রদের সমর্থন পেলেও রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন, তিনি এমন বৈঠকে কোনো প্রয়োজন দেখছেন না। একই সঙ্গে তিনি পুনরায় ঘোষণা করেন যে রাশিয়া সামরিক উপায়ে তার কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করবে।

 

জেলেনস্কির ওই চিঠি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি শুধু পুতিনের উদ্দেশে লেখা ছিল না; বরং রাশিয়ার রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অভিজাত শ্রেণি, পশ্চিমা মিত্র এবং আন্তর্জাতিক জনমতের প্রতিও একটি বার্তা ছিল। যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিণতির বিষয়টি সামনে আনার চেষ্টা ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

 

অন্যদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ই যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন নতুন কৌশল প্রয়োগ করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা রাশিয়ার অভ্যন্তরে তেল স্থাপনা, নৌঘাঁটি এবং সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। পাল্টা হিসেবে রাশিয়াও ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিধি ও প্রযুক্তিগত মাত্রা উভয়ই বিস্তৃত হয়েছে।

 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন, বর্তমানে পুতিন এমন এক অবস্থানে রয়েছেন যেখানে যুদ্ধ পুরোপুরি জেতাও কঠিন, আবার বড় ধরনের ছাড় দিয়ে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসাও রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। একইভাবে ইউক্রেনও তার ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো বড় ছাড় দিতে রাজি নয়। ফলে যুদ্ধ থামানোর পথ যতটা সামরিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে।

 

ইউক্রেনের অভ্যন্তরে পরিচালিত সাম্প্রতিক জরিপগুলোও খুব বেশি আশাবাদী চিত্র দেখায় না। দেশটির অনেক নাগরিক মনে করেন, আগামী এক বছরের মধ্যেও যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। যুদ্ধের দীর্ঘায়ন নিয়ে একই ধরনের উদ্বেগ ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাড়ছে।

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্থায়িত্বকাল অতিক্রম করা নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে আধুনিক বিশ্বের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সত্ত্বেও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয় এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাত এখনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন শুধু দুই দেশের লড়াই নয়; এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক দীর্ঘ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

 

যুদ্ধটি কোথায় গিয়ে থামবে, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট-চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাত ইতোমধ্যেই আধুনিক ইউরোপীয় ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল যুদ্ধগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ