খামেনির জানাজা-দাফনের দিনক্ষণ নির্ধারণ

খামেনির জানাজা-দাফনের দিনক্ষণ নির্ধারণ
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা ও দাফনের বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তেহরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, আগামী ৪ জুলাই রাজধানী তেহরানে তাঁর রাষ্ট্রীয় জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। কয়েকদিনব্যাপী জাতীয় শোক কর্মসূচি ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পর ৯ জুলাই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পবিত্র শহর মাশহাদে তাঁকে দাফন করা হবে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শুধু রাজধানী তেহরানে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রদেশে স্মরণসভা, দোয়া মাহফিল, শোক সমাবেশ এবং ধর্মীয় কর্মসূচির আয়োজন করা হবে। ইরানি কর্মকর্তারা আশা করছেন, লাখো মানুষ শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে এসব অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

 

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় নিহত হন। হামলাটি ছিল ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বৃহত্তর সংঘাতের প্রথম দিনেই সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। পরদিন ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন তাঁর মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে।

 

ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে খামেনির মৃত্যু একটি যুগের অবসান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ১৯৮৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর তিনি দেশের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। এরপর প্রায় ৩৭ বছর ধরে তিনি ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক এবং ধর্মীয় কাঠামোর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব ধরে রাখেন। তাঁর সময়েই ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয় এবং একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ আরও গভীর হয়।

 

খামেনির জন্ম ১৯৩৯ সালে পবিত্র শহর মাশহাদে। ধর্মীয় শিক্ষার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এই শিয়া আলেম ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট এবং পরে সর্বোচ্চ নেতা হন। তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আন্দোলনের মতো একাধিক বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে।

 

প্রাথমিকভাবে মার্চ মাসের শুরুতে তাঁর রাষ্ট্রীয় জানাজা আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও নিরাপত্তাজনিত কারণে সেই কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। পরে কয়েক দফা আলোচনা শেষে জুলাই মাসে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

 

ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁর মরদেহ নিজ জন্মস্থান মাশহাদে নেওয়া হবে। সেখানেই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্রের নিকটে তাঁকে সমাহিত করা হবে। মাশহাদ শুধু তাঁর জন্মস্থানই নয়, বরং শিয়া মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র নগরী হিসেবেও পরিচিত।

 

খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে নেতৃত্ব পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। দেশটির বিশেষজ্ঞ পরিষদ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এবং পরবর্তী নেতৃত্ব কাঠামো গঠনের কাজ এগিয়ে নেয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় চার দশক ধরে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একজন নেতার মৃত্যু শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, খামেনির জানাজা শুধু একটি ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি হবে আধুনিক ইরানের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত। কারণ তাঁর নেতৃত্বেই ইরান একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের চাপ মোকাবিলা করেছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়েছে। ফলে জুলাইয়ের শোকানুষ্ঠান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনারও কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ