{{ news.section.title }}
সাবমেরিন ক্যাবল রক্ষায় নতুন ড্রোন প্রযুক্তি তৈরি করবে আকাস
সামরিক জোট আকাসের অধীনে সাবমেরিন ক্যাবল সুরক্ষা এবং সমুদ্রতলের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে মানববিহীন ডুবোযান বা আন্ডারওয়াটার ড্রোন প্রযুক্তি তৈরির ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত শাংরি-লা ডায়ালগ নিরাপত্তা সম্মেলনের ফাঁকে তিন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা এই ঘোষণা দেন। আকাসের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নতুন মানববিহীন ডুবোযান বা ইউইউভি প্রযুক্তির সরবরাহ ২০২৭ সাল থেকে শুরু হবে। এসব ডুবোযান নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সাবমেরিনবিরোধী অভিযান, মাইন মোকাবিলা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং সমুদ্রতলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় ব্যবহার করা হতে পারে।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি জানিয়েছেন, তার দেশ এই উদ্যোগে ১৫ কোটি পাউন্ড, অর্থাৎ প্রায় ২০ কোটি ১০ লাখ ডলার অবদান রাখবে। তিনি বলেন, আকাস নিয়ে এতদিন অনেক আলোচনা হলেও বাস্তব অগ্রগতি তুলনামূলক কম ছিল। এখন তিন দেশের সরকার যৌথভাবে কাজের গতি বাড়াতে চায়।
সাবমেরিন ক্যাবল বর্তমান বিশ্ব যোগাযোগব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট, আর্থিক লেনদেন, সামরিক যোগাযোগ এবং তথ্য আদান-প্রদানের বড় অংশ সমুদ্রতলের ক্যাবলের ওপর নির্ভরশীল। তাই এসব ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু কোনো একটি দেশের নয়, পুরো অঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় প্রভাব পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সমুদ্রতলের ক্যাবল ও পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে সন্দেহজনক জাহাজ চলাচল, গোপন নজরদারি এবং সামুদ্রিক অবকাঠামোর ওপর সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি এখন বড় নিরাপত্তা ইস্যু হয়ে উঠেছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস বলেছেন, সমুদ্রতল এখন নতুন এক ধরনের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
আকাস জোটের নতুন ড্রোন প্রযুক্তি মূলত এই পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতার জবাব হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এসব মানববিহীন ডুবোযান প্রচলিত সাবমেরিনের তুলনায় কম ব্যয়ে দীর্ঘ সময় পানির নিচে নজরদারি চালাতে পারবে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের উপস্থিতি ছাড়াই তথ্য সংগ্রহ বা প্রতিরক্ষামূলক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
২০২১ সালে যাত্রা শুরু করা আকাস প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ভাগাভাগি এবং অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন সক্ষমতা দেওয়া। তবে এই চুক্তি শুধু সাবমেরিন প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, হাইপারসনিক অস্ত্র এবং সমুদ্রতলের যুদ্ধক্ষমতা বাড়ানোও আকাসের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ-উপস্থিতি, দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক তৎপরতা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ঘিরে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আকাসকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জোট হিসেবে দেখা হয়। যদিও তিন দেশ সরাসরি কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো সুরক্ষার কথা বলছে, বিশ্লেষকদের মতে এই উদ্যোগের পেছনে চীনের সামরিক প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টি স্পষ্ট।
চীন বরাবরই আকাস জোটের সমালোচনা করে আসছে। বেইজিংয়ের দাবি, এ ধরনের সামরিক জোট আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া বলছে, আকাসের লক্ষ্য হলো সমুদ্রপথে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং মিত্রদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করা।
নতুন আন্ডারওয়াটার ড্রোন প্রকল্পের মাধ্যমে আকাস জোট প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষায় আরও এক ধাপ এগোতে চাইছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু আকাশ, স্থল বা সাগরের ওপরিভাগে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সমুদ্রতলও হয়ে উঠবে প্রতিযোগিতা ও প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই সাবমেরিন ক্যাবল ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় এই ড্রোন প্রযুক্তি তৈরি করতে যাচ্ছে আকাস।