বিশ্ববাজারে চীনা ইভির দাপট, এপ্রিলে রপ্তানি বেড়েছে ৪০%

বিশ্ববাজারে চীনা ইভির দাপট, এপ্রিলে রপ্তানি বেড়েছে ৪০%
ছবির ক্যাপশান, বিশ্ববাজারে চীনা ইভির দাপট, এপ্রিলে রপ্তানি বেড়েছে ৪০%

বিশ্ববাজারে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির দাপট আরও জোরালো হচ্ছে। গত এপ্রিল মাসে দেশটির বৈদ্যুতিক যান বা ইভি রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে চীন থেকে মোট ২ লাখ ৭৮ হাজার ৮১টি বৈদ্যুতিক গাড়ি বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে। এর ফলে বছরের শুরু থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মোট রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৯৩ হাজার ৮৫২টিতে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি শুধু চীনা গাড়ি শিল্পের শক্ত অবস্থানই তুলে ধরছে না, বরং বৈশ্বিক গাড়ির বাজারে চলমান বড় পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা, পরিবেশবান্ধব যানবাহনের চাহিদা বৃদ্ধি এবং তুলনামূলক কম দামের কারণে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি বিভিন্ন অঞ্চলে আগ্রহ বাড়ছে।

 

মহাদেশভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল এশিয়া। অঞ্চলটিতে রপ্তানি হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৬১৩টি গাড়ি। এরপর রয়েছে ইউরোপ, যেখানে গেছে ৮৩ হাজার ৮১৩টি গাড়ি। লাতিন আমেরিকায় রপ্তানি হয়েছে ৫২ হাজার ৮৯৭টি। ওশেনিয়ায় গেছে ২২ হাজার ৬৯৫টি এবং উত্তর আমেরিকায় রপ্তানি হয়েছে ৪ হাজার ৪২২টি চীনা বৈদ্যুতিক যান।

 

দেশভিত্তিক হিসাবে ব্রাজিলে চীনা ইভির চাহিদা সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে। এপ্রিল মাসে দেশটি ৩৮ হাজার ১৪৪টি বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২২১ শতাংশ বেশি। দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়াতেও চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব দেশে আমদানি বৃদ্ধির হার ১০০ থেকে ১৯০ শতাংশের মধ্যে ছিল।

 

চীনের এই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এমন সময়ে দেখা গেল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো চীনা গাড়ির বাজার সম্প্রসারণ ঠেকাতে নানা ধরনের শুল্ক ও বিধিনিষেধ আরোপ করছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে। পাশাপাশি চীনা সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আনা হয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনা ইভির ওপর সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক বসিয়েছে।

 

তবে এসব বাধা সত্ত্বেও চীনা কোম্পানিগুলো এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ওশেনিয়ার বাজারে দ্রুত প্রভাব বাড়াচ্ছে। শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা, বড় উৎপাদনক্ষমতা, তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচ এবং দীর্ঘদিনের সরকারি সহায়তা চীনা কোম্পানিগুলোকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রেখেছে।

 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে চীন এখন সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদিত হয়েছে, যার প্রায় ৭৫ শতাংশই চীনে তৈরি। একই বছর চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি রপ্তানি রেকর্ড ২৫ লাখের বেশি ইউনিটে পৌঁছায়। দেশটির উৎপাদন অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে বেশি হওয়ায় নির্মাতারা এখন বিদেশি বাজারে আরও বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

 

বৈশ্বিক বাজারেও বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী ২ কোটির বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হয়েছে, যা মোট গাড়ি বিক্রির প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ২০২৬ সালে এই বিক্রি ২ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা মোট গাড়ি বিক্রির প্রায় ৩০ শতাংশ।

 

চীনা কোম্পানিগুলোর দ্রুত অগ্রযাত্রায় পশ্চিমা গাড়ি নির্মাতাদের ওপর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে বিওয়াইডিসহ চীনের বড় ইভি নির্মাতারা উৎপাদন, মূল্য এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ফলে বৈশ্বিক ইভি বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধি আগামী দিনে বৈশ্বিক গাড়ি শিল্পের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে শুল্ক, বাণিজ্যনীতি, স্থানীয় উৎপাদন বাধ্যবাধকতা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ