{{ news.section.title }}
নতুন যুদ্ধকৌশলে রাশিয়াকে চাপে ফেলছে ইউক্রেন
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের চেহারা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় যেখানে সম্মুখসারিতে সৈন্যদের সরাসরি সংঘর্ষ ছিল যুদ্ধের প্রধান দৃশ্য, এখন সেখানে ক্রমেই বড় ভূমিকা নিচ্ছে ড্রোন, রোবট ও দূরনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধাস্ত্র। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, জনবলসংকট এবং পশ্চিমা সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ইউক্রেন এখন প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধকৌশলকে আরও গুরুত্ব দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন এমন কিছু অভিযান চালিয়েছে, যেখানে কোনো সৈন্য সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে না গিয়েও রুশ অবস্থানে আঘাত হানা হয়েছে। বিস্ফোরক বহনকারী স্থল রোবট রুশ অবস্থানের দিকে এগিয়ে গেছে, আকাশে থাকা নজরদারি ড্রোন পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করেছে, আর নিরাপদ দূরত্বে থাকা নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে অপারেটররা পরিচালনা করেছেন পুরো অভিযান। এতে ইউক্রেনীয় সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি কমছে এবং তুলনামূলক বড় রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন কৌশলগত সুবিধা তৈরি হচ্ছে।
গত এপ্রিল মাসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেন, যুদ্ধের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কেবল ড্রোন ও মানববিহীন স্থলযান ব্যবহার করে একটি রুশ অবস্থান দখল করতে সক্ষম হয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। তার দাবি অনুযায়ী, ওই অভিযানে ইউক্রেনীয় পদাতিক বাহিনী সরাসরি অংশ নেয়নি এবং নিজেদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই রুশ সেনাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হয়।
ইউক্রেনীয় বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে মানববিহীন স্থল রোবট দিয়ে ২২ হাজারের বেশি মিশন পরিচালনা করা হয়েছে। এসব মিশনের মধ্যে ছিল নজরদারি, রসদ সরবরাহ, আহত সেনা সরিয়ে নেওয়া, মাইন অপসারণ, আক্রমণ এবং সামনের সারির সেনাদের সহায়তা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় এই ধরনের প্রযুক্তি এখন ইউক্রেনের সামরিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
রুশ সেনাদের মধ্যেও এসব রোবট নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে ইউক্রেনীয় সেনারা দাবি করছেন। বন্দি হওয়া কিছু রুশ সেনা বিস্ফোরকবাহী রোবটগুলোর নাম দিয়েছে ‘নীরব মৃত্যু’। কারণ এসব যন্ত্র এতটাই নিঃশব্দে এগিয়ে যায় যে অনেক সময় খুব কাছাকাছি পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত সেগুলোর উপস্থিতি বোঝা যায় না। তখন পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে খুব সীমিত।
পূর্ব ইউক্রেনের দনবাসসহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধক্ষেত্রে আগে সরাসরি লড়াই করা অনেক কমান্ডারের কাছেও এই পরিবর্তন বড় বিস্ময়। তাদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে যেখানে মানুষের সাহস, প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলাই সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল, এখন সেখানে প্রযুক্তি যুদ্ধের হিসাব পাল্টে দিচ্ছে। একজন কমান্ডারের ভাষায়, আগে এমন প্রযুক্তি থাকলে হয়তো অনেক সহযোদ্ধার জীবন রক্ষা করা যেত।
ইউক্রেনের নতুন কৌশলের আরেকটি লক্ষ্য হলো রাশিয়ার ওপর ধারাবাহিক চাপ তৈরি করা। ড্রোন ও রোবটের মাধ্যমে সামনের সারির পাশাপাশি রুশ বাহিনীর পেছনের ঘাঁটি, রসদপথ, গোলাবারুদের গুদাম, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্কে আঘাত হানার চেষ্টা করছে কিয়েভ। এতে রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা ধীর করা এবং তাদের যুদ্ধক্ষমতা ক্ষয় করাই ইউক্রেনের উদ্দেশ্য।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন মধ্যম পাল্লার ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। এসব হামলায় সামনের যুদ্ধরেখা থেকে ৩০ থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরের রুশ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি বিভিন্ন ড্রোন ব্যবহার করে গোলাবারুদের মজুত, সামরিক ঘাঁটি এবং রসদ পরিবহনপথ লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এতে রাশিয়ার পেছনের অবস্থানও আর নিরাপদ থাকছে না।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, তারা প্রতি মাসে রুশ বাহিনীর ওপর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। এর লক্ষ্য হলো রাশিয়াকে আরও বেশি জনবল নিয়োগে বাধ্য করা এবং যুদ্ধের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ দেশটির ভেতরে বাড়িয়ে তোলা। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের হতাহতের নির্ভরযোগ্য সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
ড্রোন ও রোবটের ব্যবহার এখন শুধু আক্রমণে সীমাবদ্ধ নেই। আহত সৈন্যকে সরিয়ে নেওয়া, সামনের সারিতে খাবার ও গোলাবারুদ পৌঁছে দেওয়া, নজরদারি করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সেনাদের বদলে যন্ত্র পাঠানো সব ক্ষেত্রেই ইউক্রেন এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এতে সেনাদের সরাসরি প্রাণহানির ঝুঁকি কিছুটা কমছে, যদিও রাশিয়াও পাল্টা ড্রোন ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এখন আধুনিক যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে, তার একটি বাস্তব পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। এখানে শুধু ট্যাংক, কামান বা পদাতিক বাহিনী নয়; বরং সফটওয়্যার, সেন্সর, ড্রোন, রোবট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দূরনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রও যুদ্ধের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে।
সব মিলিয়ে ইউক্রেনের নতুন যুদ্ধকৌশল রাশিয়ার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। জনবলে পিছিয়ে থেকেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে কিয়েভ যুদ্ধক্ষেত্রে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছে। তবে এই কৌশল কতটা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন সক্ষমতা, পশ্চিমা সহায়তা, রুশ প্রতিরোধ এবং যুদ্ধক্ষেত্রের দ্রুত বদলে যাওয়া বাস্তবতার ওপর।