{{ news.section.title }}
পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে ট্রেনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ২৪
পাকিস্তানের অশান্ত বেলুচিস্তান প্রদেশের রাজধানী কোয়েটায় জাফর এক্সপ্রেসের সঙ্গে যুক্ত একটি শাটল ট্রেনে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৭০ থেকে ৮২ জনের বেশি। রোববার (২৪ মে) সকালে কোয়েটার চামান ফটক এলাকার কাছে এ হামলা হয়। বিস্ফোরণের পর ট্রেনের ইঞ্জিনসহ কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয় এবং দুটি বগিতে আগুন ধরে যায় বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রেনটি কোয়েটার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে যাত্রীদের নিয়ে যাচ্ছিল, যারা পরে জাফর এক্সপ্রেসে করে ঈদের ছুটিতে নিজ নিজ গন্তব্যে যাওয়ার কথা ছিল। ট্রেনটিতে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন বলে নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে। স্থানীয় সময় সকাল ৮টার কিছু পর চামান ফটকের কাছে বিস্ফোরণটি ঘটে।
পুলিশ ও নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বিস্ফোরণটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে ট্রেনের একাধিক বগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আশপাশের কয়েকটি যানবাহন ভেঙে যায় এবং নিকটবর্তী ভবনের কাচও ভেঙে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। বিস্ফোরণের পরপরই নিরাপত্তা বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে এবং উদ্ধারকর্মীরা আহতদের হাসপাতালে নেওয়া শুরু করেন।
প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, বিস্ফোরকভর্তি একটি গাড়ি ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয়েছে। এপি জানিয়েছে, হামলাকারী বিস্ফোরকবোঝাই গাড়ি ট্রেনের কাছাকাছি নিয়ে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে দুটি বগি উল্টে যায় এবং আগুন ধরে যায়। তবে বিস্ফোরণের প্রকৃতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত এখনো চলছে। রয়টার্স জানিয়েছে, নিরাপত্তা সূত্র এটিকে আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলা বলে ধারণা করছে, তবে বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এপি জানিয়েছে, কোয়েটার হাসপাতালগুলোতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় এবং আহতদের মধ্যে অন্তত ২০ জনের অবস্থা গুরুতর। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আহতদের সামরিক হাসপাতাল ও কোয়েটার সিভিল হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে ৫৭ জনকে সামরিক হাসপাতালে এবং ২৫ জনকে কোয়েটার সিভিল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান-এপিপির বরাতে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, ট্রেনটি কোয়েটা ক্যান্টনমেন্ট থেকে রেলস্টেশনের দিকে যাচ্ছিল। সেখান থেকে যাত্রীদের ঈদের ছুটিতে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার জন্য সংযোগ ট্রেন ধরার কথা ছিল। বিস্ফোরণের পর পাকিস্তান রেলওয়ে উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য ঘটনাস্থলে রেসকিউ ট্রাক ও একটি ত্রাণ ট্রেন পাঠায়। ট্রেনের ইঞ্জিনসহ তিনটি বগি লাইনচ্যুত হয় এবং দুটি বগি উল্টে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলার দায় স্বীকার করেছে বেলুচ লিবারেশন আর্মি-বিএলএ। সংগঠনটি দাবি করেছে, ট্রেনটি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বহন করছিল। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তাদের এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। পাকিস্তান সরকার বিএলএকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে। বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতায় গত কয়েক বছরে নিরাপত্তা বাহিনী, রেলপথ, জ্বালানি অবকাঠামো ও সরকারি স্থাপনা বারবার হামলার লক্ষ্য হয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ও বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতিও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। এপি জানিয়েছে, পাকিস্তান সরকার এই হামলাকে নিরীহ মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে দেখছে।
বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম জনবহুল প্রদেশ। প্রদেশটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা সংকট, বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের কারণে অস্থির। অঞ্চলটি ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী হওয়ায় কৌশলগতভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্স জানিয়েছে, এই হামলা বেলুচিস্তানে সাম্প্রতিক সহিংসতার ধারাবাহিকতার অংশ, যার মধ্যে ২০২৫ সালের জাফর এক্সপ্রেস ছিনতাই এবং ২০২৬ সালের বড় ধরনের পাল্টা অভিযানও রয়েছে।
এর আগেও জাফর এক্সপ্রেস একাধিকবার হামলার লক্ষ্য হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে বেলুচিস্তানে জাফর এক্সপ্রেসে বড় ধরনের ছিনতাই ও জিম্মি সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনায় বহু যাত্রী, নিরাপত্তা সদস্য ও হামলাকারী নিহত হয়। ওই ঘটনার পর পাকিস্তান রেলওয়ে নিরাপত্তা জোরদার, রেলপথে নজরদারি বৃদ্ধি এবং সংবেদনশীল রুটে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা জানিয়েছিল। তবু সর্বশেষ হামলা দেখিয়েছে, প্রদেশটির রেল যোগাযোগ এখনো বড় নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঈদের আগে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ যাত্রী বহনকারী ট্রেনকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো শুধু প্রাণহানির উদ্দেশ্যে নয়; বরং পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোরও একটি বার্তা। রেলপথে এ ধরনের হামলা সাধারণ মানুষের চলাচল, আন্তঃপ্রাদেশিক যোগাযোগ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
ঘটনার পর চামান ফটক ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা বিস্ফোরকের ধরন, হামলার পরিকল্পনা, গাড়ির উৎস এবং হামলাকারীদের সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক খতিয়ে দেখছেন। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স