কী কারণে পদত্যাগ করলেন শ্রীলঙ্কার জ্বালানি মন্ত্রী?

কী কারণে পদত্যাগ করলেন শ্রীলঙ্কার জ্বালানি মন্ত্রী?
ছবির ক্যাপশান, শ্রীলঙ্কার জ্বালানিমন্ত্রী কুমারা জয়াকোডি | ছবি: সংগৃহীত

শ্রীলঙ্কায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নিম্নমানের কয়লা আমদানির অভিযোগ ঘিরে তীব্র বিতর্কের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন দেশটির বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী কুমারা জয়াকোডি। একই সঙ্গে পদত্যাগ করেছেন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিব উদয়ঙ্গা হেমাপালা। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) তারা প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ করে দিতেই জয়াকোডি পদত্যাগ করেছেন।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে শ্রীলঙ্কার একমাত্র কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র লাকভিজয়া পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য আমদানি করা কয়লার মান। অভিযোগ উঠেছে, নিম্নমানের কয়লার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকে এরই মধ্যে ২০০৯ সাল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য করা সব কয়লা আমদানির ওপর পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। সরকার বলছে, তদন্ত শেষ হতে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে এবং এর উদ্দেশ্য হলো জনআস্থা পুনরুদ্ধার ও ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

 

শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিথা হেরাথ সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা কিছুই গোপন করার চেষ্টা করছি না। সব ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ম মেনেই হয়েছে, এবং সরাসরি দুর্নীতির কোনো প্রমাণ নেই।” তবে তিনি স্বীকার করেছেন, সরবরাহ করা কয়লার মান কম ছিল, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে সমস্যা তৈরি করেছে। ইকোনমি নেক্সটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার দাবি করছে নমুনা পরীক্ষা ও স্বাধীন আন্তর্জাতিক ল্যাব ব্যবহারের মতো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল, তবুও কয়লার মান নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ায় মন্ত্রীর পদত্যাগ পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

এই পদত্যাগ রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কুমারা জয়াকোডি বর্তমান সরকারের প্রথম উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রী, যিনি দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে পদ ছাড়লেন। এর আগে তার বিরুদ্ধে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হলেও তা গত সপ্তাহে খারিজ হয়ে যায়। তবুও জনসমালোচনা ও তদন্তের চাপের মুখে তিনি শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়ালেন। প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকে ২০২৪ সালে ক্ষমতায় আসেন দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে, ফলে এই কয়লা বিতর্ক তার সরকারের জন্যও বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

লাকভিজয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র শ্রীলঙ্কার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কেন্দ্রটি দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ জোগান দেয়। বছরে প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা দরকার হয় কেন্দ্রটির কার্যক্রম চালাতে। কিন্তু নিম্নমানের কয়লার কারণে উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিলে গত মাসে জরুরি ভিত্তিতে ৩ লাখ মেট্রিক টন কয়লা আমদানি করতে হয়। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ঘাটতি পুষিয়ে নিতে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক তাপবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে।

 

শ্রীলঙ্কার জন্য এই সংকট আরও সংবেদনশীল, কারণ দেশটি কয়েক বছর আগে তীব্র অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, জ্বালানি আমদানির চাপ এবং বিদ্যুৎ সংকট একসময় দেশটিকে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং, জ্বালানি রেশনিং এবং জরুরি সরকারি পদক্ষেপের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এখনো শ্রীলঙ্কা জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

সূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ