প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ চাইলেন হাঙ্গেরির নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী

প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ চাইলেন হাঙ্গেরির নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী
ছবির ক্যাপশান, হাঙ্গেরির নতুন প্রধানমন্ত্রী হলেন পিটার মাগয়ার | ছবি: সংগৃহীত

হাঙ্গেরির ঐতিহাসিক নির্বাচনে জয় পাওয়ার পর রাজনৈতিক সংস্কারের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী পিটার মাগয়ার। তিনি শুধু রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দেননি, একইসঙ্গে প্রেসিডেন্ট তামাস সুলিয়কের পদত্যাগও দাবি করেছেন।

বুধবার (১৫ এপ্রিল ) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকার এবং পরে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি জানান, নতুন সরকার দ্রুত দায়িত্ব নিলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে।

 

রয়টার্স ও এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত রোববারের নির্বাচনে পিটার মাগয়ারের দল তিসা পার্টি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় পেয়েছে। এই জয়ের মধ্য দিয়ে টানা ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের শাসনের অবসান ঘটেছে। প্রেসিডেন্ট তামাস সুলিয়কের সঙ্গে বৈঠকের পর মাগয়ার বলেন, নতুন পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনেই তাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে এবং মে মাসের শুরু থেকেই নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে পারে।

 

ক্ষমতায় এসে প্রথমদিকের পদক্ষেপ কী হবে, সে বিষয়েও খোলামেলা অবস্থান জানিয়েছেন মাগয়ার। তিনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সংবাদ সম্প্রচার সাময়িকভাবে স্থগিত করার কথা বলেছেন। তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে হাঙ্গেরির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সরকারপন্থী প্রচারযন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। রাষ্ট্রীয় টিভিতে দীর্ঘ বিরতির পর এক সাক্ষাৎকারে অংশ নিয়ে তিনি উপস্থাপকদের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের সমালোচনা করেন। পরে সামাজিক মাধ্যমে এই অভিজ্ঞতাকে তিনি “প্রচারযন্ত্রের শেষ দিন” বলে উল্লেখ করেন। রয়টার্স বলছে, তিনি নতুন মিডিয়া আইন, নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হাঙ্গেরির গণমাধ্যমকে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করছেন।

 

মাগয়ার বলেন, প্রতিটি হাঙ্গেরিয়ান নাগরিকের অধিকার আছে এমন একটি গণমাধ্যম পাওয়ার, যা সত্য প্রচার করবে। তিনি আরও জানিয়েছেন, গণমাধ্যম সংস্কার এক দিনে সম্ভব হবে না; এর জন্য নতুন আইন, নতুন তদারকি সংস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, তার এই অবস্থান ইউরোপীয় গণমাধ্যম-স্বাধীনতা মহলেও ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে, যদিও সংস্কারের বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো কিছু সতর্কতা রয়েছে।

 

প্রেসিডেন্ট তামাস সুলিয়ককে নিয়েও কড়া অবস্থান নিয়েছেন মাগয়ার। বুদাপেস্টে প্রেসিডেন্ট ভবনে বৈঠকের পর সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, সুলিয়ক জাতির ঐক্যের প্রতীক হওয়ার যোগ্য নন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাগয়ার মনে করেন, অরবানের আমলে নিয়োগ পাওয়া শীর্ষ রাষ্ট্রীয় পদধারীদের একটি অংশ এখনো পুরোনো শাসনের স্বার্থ রক্ষা করছে। যদি প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ না করেন, তাহলে নতুন সরকার সাংবিধানিক পথ ব্যবহার করেও তাকে অপসারণের চেষ্টা করতে পারে-এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।

 

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি বড় অর্থনৈতিক চাপও অপেক্ষা করছে নতুন সরকারের সামনে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ড নিয়ে দীর্ঘ বিরোধের কারণে হাঙ্গেরির জন্য বরাদ্দ বহু অর্থ এখনো আটকে আছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইয়েনের সঙ্গে ইতোমধ্যে কথা বলেছেন মাগয়ার। লক্ষ্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা, গণমাধ্যম ও একাডেমিক স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মতো শর্ত পূরণ করে স্থগিত থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরোর তহবিল ছাড় করানো। শুধু কোভিড পুনরুদ্ধার তহবিল থেকেই প্রায় ১০ বিলিয়ন ইউরো এখনও ঝুলে আছে, আর মোট আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ আরও বেশি।

 

এপি-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই নির্বাচনী জয় শুধু সরকার বদলের ঘটনা নয়; এটি হাঙ্গেরির রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা বদলেরও বড় ইঙ্গিত। মাগয়ার দুর্নীতি দমন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন, এবং ব্রাসেলসের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে একইসঙ্গে তাকে এমন এক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মুখোমুখি হতে হবে, যেখানে অরবানের অনুগত বহু ব্যক্তি এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল আছেন। তাই তার সামনে যেমন বড় রাজনৈতিক সুযোগ আছে, তেমনি আছে কঠিন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধের সম্ভাবনাও।

 


সম্পর্কিত নিউজ