{{ news.section.title }}
ইরানে ফের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল
পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে আবারও তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সোমবার থেকে প্রণালির নির্দিষ্ট অংশে অবরোধ কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
অবরোধের আওতাভুক্ত এলাকায় জাহাজ ঢুকলে তা আটক, দিক পরিবর্তন কিংবা জব্দ করা হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান এ পদক্ষেপকে অবৈধ ও ‘দস্যুতার শামিল’ আখ্যা দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের বন্দরগুলোতেও পাল্টা হুমকি দিয়েছে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে সামরিক প্রস্তুতির খবর সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, পাকিস্তানে রোববারের আলোচনা যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটাতে ব্যর্থ হওয়ার পর ইরানে ফের বিমান হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমান হামলার পাশাপাশি আরও কিছু পদক্ষেপও আলোচনায় রয়েছে, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ অন্যতম। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস বিবিসিকে জানায়, সব বিকল্প এখনো খোলা আছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, ইরানের চাঁদাবাজি বন্ধের উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি বিচক্ষণতার সঙ্গে অন্য সব বিকল্প বিবেচনায় রেখেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরবর্তী কী পদক্ষেপ নেবেন, এ বিষয়ে কেউ যদি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে কিছু বলে থাকেন, তা সম্পূর্ণই অনুমাননির্ভর।
এদিকে ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলোও দাবি করেছে, যুদ্ধবিরতি আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ইসরায়েল আবার ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওয়াইনেট নিউজ জানায়, আইডিএফ চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির সেনাবাহিনীকে ‘উচ্চ সতর্কতায়’ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ইরানের সঙ্গে পুনরায় লড়াই শুরুর প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। পরে চ্যানেল ১২ ও চ্যানেল ১৩ জানায়, আইডিএফ শুধু সম্ভাব্য নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতিই নিচ্ছে না, বরং ইসরায়েলের ওপর ইরানের আকস্মিক হামলার আশঙ্কাও বিবেচনায় রাখছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে ইসরায়েল। ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত অবস্থান স্পষ্ট হলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাত হেনে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর আরও চাপ বাড়াতে পারে তেল আবিব। যদিও এসব প্রতিবেদনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে আইডিএফ। তবে গত সপ্তাহে দক্ষিণ লেবানন সফরের সময় ইয়াল জামির বলেছিলেন, সামরিক বাহিনী ‘যে কোনো মুহূর্তে প্রয়োজনে পূর্ণ শক্তি নিয়ে ইরানে লড়াইয়ে ফিরতে প্রস্তুত।’
হরমুজে মার্কিন অবরোধ
ওমান উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালির পূর্বে আরব সাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। নাবিকদের উদ্দেশে দেওয়া এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, অনুমতি ছাড়া অবরোধের আওতায় থাকা এলাকায় প্রবেশ বা বের হওয়ার চেষ্টা করলে জাহাজ আটক, দিক পরিবর্তন বা জব্দ করা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট জাহাজ কোন দেশের পতাকাবাহী, সেটি বিবেচনায় নেওয়া হবে না। তবে ইরান ছাড়া অন্য কোনো দেশে যাতায়াতকারী নিরপেক্ষ জাহাজগুলোর চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছে সেন্টকম।
অবরোধ কার্যকর হওয়ার পরই ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প আরও কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, অবরুদ্ধ অঞ্চলের কাছে এলে ইরানি জাহাজ ধ্বংস করা হবে। একই পোস্টে তিনি দাবি করেন, ইরানের নৌবাহিনী কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে, যদিও কিছু ‘ফাস্ট অ্যাটাক জাহাজ’ এখনো টিকে আছে।
ইরানের কড়া প্রতিক্রিয়া
ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের হুমকিকে ‘অবৈধ’ ও ‘দস্যুতার শামিল’ বলে অভিহিত করেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুদ্ধ শেষ হলেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তেহরান ছাড়বে না। শত্রুপক্ষ-সংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজকে ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা অতিক্রম করতে দেওয়া হবে না বলেও জানানো হয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোকে উদ্দেশ করে ইরান আরও বলেছে, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ‘সবার জন্য, নতুবা কারও জন্যই নয়’। যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে, তাহলে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের অন্য কোনো বন্দরও নিরাপদ থাকবে না।
পরাশক্তি দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া
হরমুজ অবরোধের ঘোষণার সমালোচনা করেছে রাশিয়া। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ট্রাম্পের আদেশের অনেক দিক এখনো অস্পষ্ট, তবে এটি কার্যকর হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট আরও বাড়তে পারে।
যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, হরমুজে ইরানি বন্দর অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপে তারা যোগ দেবে না। বিবিসির খবরে বলা হয়, ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজ বা সেনা এই অবরোধে ব্যবহৃত হবে না, যদিও অঞ্চলটিতে তাদের মাইন অপসারণ এবং ড্রোনবিরোধী কার্যক্রম চলবে।
চীনও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বেইজিং সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শন এবং পরিস্থিতি আরও জটিল না করার আহ্বান জানিয়েছে।
নতুন আঞ্চলিক হুমকি
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে ইয়েমেন, তুরস্ক ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক অবস্থান। ইয়েমেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি আবার ইরান ও ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর বিরুদ্ধে আগ্রাসন শুরু করে, তাহলে ইয়েমেন সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেবে।
অন্যদিকে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ফিলিস্তিন ও লেবাননে ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানিয়ে প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। জবাবে ইসরায়েলের এক মন্ত্রী তাকে ‘উন্মাদ একনায়ক’ বলে আখ্যা দেন।
এদিকে দক্ষিণ লেবাননে হামলা বাড়িয়েছে ইসরায়েল। লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা, কামানের গোলা, ফসফরাস শেল এবং ড্রোন হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহও বলেছে, লেবানন ও দেশটির জনগণের বিরুদ্ধে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাদের পাল্টা হামলা চলবে।
যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পরিকল্পনায় সমর্থন জানান এবং বলেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক অটুট রয়েছে।