হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে কী কী নিয়ম মানতে হবে? জানুন বিস্তারিত

হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে কী কী নিয়ম মানতে হবে? জানুন বিস্তারিত
ছবির ক্যাপশান, হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে কী কী নিয়ম মানতে হবে? জানুন বিস্তারিত

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য “সম্পূর্ণ খুলে দেওয়া হয়েছে” বলে ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।

শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি জানান, লেবাননে যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির বাকি সময়টুকুতে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে। তবে এসব জাহাজকে ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থার পূর্বঘোষিত সমন্বিত রুট অনুসরণ করতে হবে।

 

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি পরিবহনের বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে যায়। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এই রুটে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা সত্ত্বেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো ভঙ্গুর; জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের নির্ধারিত রুট ও সমন্বয় প্রক্রিয়া মানতে হবে।

 

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সামরিক জাহাজ ছাড়া অন্যান্য জাহাজ হরমুজ দিয়ে চলাচল করতে পারবে, তবে এর জন্য ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের অনুমোদন লাগবে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজগুলোকে ইরানের নিরাপদ বলে নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার করতে হবে এবং ইরানের পোর্টস অ্যান্ড মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের সঙ্গে সমন্বয় রাখতে হবে। এই ব্যবস্থাকে তেহরান আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে দেখাচ্ছে।

 

এদিকে হরমুজ খুলে দেওয়ার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সিবিএস নিউজের লাইভ আপডেট অনুযায়ী, ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তকে “বিশ্বের জন্য একটি মহান ও চমৎকার দিন” বলে উল্লেখ করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এখনই প্রত্যাহার করা হবে না। ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তি-চুক্তি বা বৃহত্তর সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ বহাল থাকতে পারে।

 

এই অবস্থান নিয়েই তেহরানের ভেতরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইরানের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির ঘোষণার সমালোচনা করেছে। আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ তাসনিম নিউজ এজেন্সি আরাগচির পোস্টকে “অসম্পূর্ণ” বলেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকলে হরমুজ খুলে দেওয়ার ঘোষণা কার্যত অর্থহীন হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরান ইন্টারন্যাশনালও জানিয়েছে, সামরিক জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে এবং শত্রুপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজ বা কার্গোর ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকবে।

 

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আরও কড়া ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। আনাদোলুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গালিবাফ বলেছেন, মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি খোলা থাকবে না। তার ভাষায়, এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ইরানের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে এবং নির্ধারিত রুট অনুযায়ী চলবে। তিনি ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কয়েকটি দাবিকে “মিথ্যা” বলেও প্রত্যাখ্যান করেছেন।

 

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও পরে বিষয়টি স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের নির্ধারিত পথ অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ চলতে থাকলে তেহরান প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ খুলে দেওয়ার ঘোষণা বাজারে স্বস্তি দিলেও অবরোধ, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং জাহাজ চলাচলের শর্তের কারণে পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।

 

হরমুজ খুলে দেওয়ার ঘোষণার একটি বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, ইরানের ঘোষণার পর শুক্রবার তেলের দাম বড় ব্যবধানে কমেছে। তবে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো এখনো পরিস্থিতি যাচাই করছে এবং অনেক বাণিজ্যিক অপারেটর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ফলে ঘোষণার পরও এই রুটে স্বাভাবিক মাত্রার জাহাজ চলাচল দ্রুত ফিরে আসবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

 

সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খুলে দেওয়ার ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকেত। তবে মার্কিন নৌ অবরোধ, ইরানের নির্ধারিত রুটের শর্ত, সামরিক জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা এবং তেহরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ-সব মিলিয়ে এই সিদ্ধান্ত এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল সমাধানের ইঙ্গিত দিচ্ছে না। বরং আগামী কয়েক দিনই ঠিক করবে, হরমুজ সত্যিই বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য নিরাপদভাবে খুলে থাকবে, নাকি আবারও উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে যাবে।

 


সম্পর্কিত নিউজ