{{ news.section.title }}
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের ৫২তম দিন: ইরান যুদ্ধে কী ঘটছে?
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ইরানের পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজ আটকের পর ওয়াশিংটন-তেহরান যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, জাহাজটি মার্কিন অবরোধ এড়িয়ে ইরানের বন্দরে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। অন্যদিকে ইরান এই পদক্ষেপকে “সশস্ত্র জলদস্যুতা” আখ্যা দিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফা আলোচনার চেষ্টা করলেও তেহরান এখনো তাতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। বরং ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, চলমান অবরোধ, ওয়াশিংটনের হুমকিমূলক ভাষা, অবস্থান পরিবর্তন এবং “অতিরিক্ত দাবি”র কারণে নতুন আলোচনায় অংশ নেবে না তেহরান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার জানান, মার্কিন মেরিন সদস্যরা হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের পতাকাবাহী একটি কনটেইনার জাহাজ আটক করেছে। তার দাবি, জাহাজটি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এড়ানোর চেষ্টা করছিল। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, জাহাজটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এতে কী আছে তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, জাহাজটি চীন থেকে আসছিল। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে এক সামরিক মুখপাত্র বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের এই “সশস্ত্র জলদস্যুতার” জবাব দেবে এবং প্রতিশোধ নেবে।
শান্তি আলোচনা ঘিরে অনিশ্চয়তা
ট্রাম্প এর আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধি দল সোমবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যাবে। সেখানে ইরানের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা যুদ্ধবিরতি আলোচনা শুরু করার কথা ছিল। তবে ইরান আলোচনায় অংশ না নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াই অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বুধবার শেষ হওয়ার কথা। তার আগে কোনো সমঝোতা না হলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন। ইসলামাবাদ জানিয়েছে, তারা সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার জন্য প্রস্তুত। এর আগে পাকিস্তানই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রথম দফা আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও বলেছেন, তিনি আশাবাদী-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি আরও বাড়ানো যেতে পারে, যাতে আলোচনার জন্য বাড়তি সময় পাওয়া যায়।
হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা, জ্বালানি বাজারে ধাক্কা
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বহাল রেখেছে। অন্যদিকে ইরানও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সামুদ্রিক যানবাহনের ওপর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পর আবার কড়াকড়ি আরোপ করেছে। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়।
হরমুজ প্রণালির কার্যত বন্ধ হয়ে পড়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। তেলের দাম বেড়েছে, শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং বিভিন্ন দেশ জরুরি জ্বালানি মজুত ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ফরাসি শিপিং কোম্পানি সিএমএ সিজিএম জানিয়েছে, শনিবার হরমুজ প্রণালিতে তাদের একটি জাহাজের দিকে “সতর্কতামূলক গুলি” ছোড়া হয়। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও রোববার হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা দুটি ট্যাংকারকে সতর্কবার্তা দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম।
কোথায় কত হতাহত
আল জাজিরার লাইভ ট্র্যাকার অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ এপ্রিল ১৬:৪৫ জিএমটি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি ও ইরানি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে। ট্র্যাকারটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, লেবাননে ২ হাজার ১৬৭ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৬১ জন আহত হয়েছেন। ইরানে নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৭৬ জন, আহত ২৬ হাজার ৫০০ জন। তবে ইরানের সংখ্যাগুলো সর্বশেষ ৩ এপ্রিল হালনাগাদ করা হয়েছে।
ইসরায়েলে ২৬ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৬৯৩ জন আহত হয়েছেন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ১৩ সদস্য নিহত এবং ২০০ জন আহত হয়েছেন। ইরাকে ১৮ জন নিহত এবং ডজনখানেকের বেশি আহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কুয়েতে ৭ জন নিহত ও ডজনখানেক আহত, বাহরাইনে ৩ জন নিহত ও ডজনখানেক আহত, কাতারে ২০ জন আহত, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১২ জন নিহত ও ২২৪ জন আহত, ওমানে ৩ জন নিহত ও ১৫ জন আহত, সৌদি আরবে ৩ জন নিহত ও ২৯ জন আহত এবং জর্ডানে ২৯ জন আহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে ৪ জন করে নিহত হয়েছেন।
এই হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশে নিহতের সংখ্যা ৪ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে। তবে আল জাজিরার গ্রাফিকেই সতর্ক করে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে, ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার পাশাপাশি লেবাননেও অস্থিরতা
যুদ্ধ এখন অষ্টম সপ্তাহে গড়িয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা এবং একই সময়ে লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং আশপাশের এমন কয়েকটি আরব দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
লেবাননে যুদ্ধবিরতি চললেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের নির্দিষ্ট কয়েকটি গ্রামের দক্ষিণে না যেতে এবং লিতানি নদীর আশপাশের এলাকায় না যাওয়ার সতর্কতা দিয়েছে। ইসরায়েল বলছে, হিজবুল্লাহর তৎপরতার কারণে তাদের সেনারা ওই এলাকায় মোতায়েন রয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি চললেও হিজবুল্লাহর দিক থেকে কোনো হুমকি তৈরি হলে লেবাননে “পূর্ণ শক্তি” ব্যবহার করবে ইসরায়েলি বাহিনী।
তেলের বাজারে ধাক্কা
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায় সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। তবে সংকট সমাধানে সম্ভাব্য চুক্তির আশাও এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে কিছু শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।
হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়। যুদ্ধের কারণে প্রণালিটি কার্যত সীমিত হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
দ্রুত চুক্তি নিয়ে ইউরোপের উদ্বেগ
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ, যিনি আলোচনায় ইরানের পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, এর আগে বলেছিলেন-দুই পক্ষ কিছু অগ্রগতি করলেও পারমাণবিক ইস্যু এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে এখনো তাদের অবস্থান অনেক দূরে। এদিকে ইউরোপীয় মিত্ররা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। ট্রাম্প বারবার অভিযোগ করেছেন, ইউরোপীয় দেশগুলো তার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় যথেষ্ট সহায়তা করছে না। তবে ইউরোপীয়দের আশঙ্কা, ওয়াশিংটনের আলোচক দল হয়তো দ্রুত একটি উপরিভাগের সমঝোতায় পৌঁছাতে চাইছে, যার পরবর্তী ধাপে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর জটিল প্রযুক্তিগত আলোচনার প্রয়োজন হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানি জাহাজ আটক, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা, তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং শান্তি আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা-সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি আবারও বড় ধরনের সংঘাতের দিকে মোড় নিতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা