{{ news.section.title }}
৫৭ দিন বন্ধ থাকার পর আবার চালু ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট
দীর্ঘ প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকার পর ইরানের রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবারও বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর নিরাপত্তাজনিত কারণে ইরান আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। সেই অবস্থায় দেশটির প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অবশেষে যুদ্ধবিরতির মধ্যে সীমিত পরিসরে ফ্লাইট চালু হওয়ায় ইরানের বিমান চলাচল খাতে স্বাভাবিকতায় ফেরার প্রাথমিক ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
আল জাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর প্রায় দুই মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার এই বিমানবন্দর থেকে ইস্তাম্বুল, মাসকাট ও সৌদি আরবের মদিনার উদ্দেশে ফ্লাইট ছেড়ে যায়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, ৫৬ দিনের বিরতির পর ইরান এয়ার তেহরান থেকে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদে একটি উদ্বোধনী ফ্লাইট পরিচালনা করে। আগামী দিনগুলোতে বাকু, নাজাফ, বাগদাদ ও দোহার উদ্দেশে আরও ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
এখনো সীমিত পরিসরে ফ্লাইট
স্বাভাবিক সময়ে ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন শতাধিক ফ্লাইট পরিচালিত হতো। কিন্তু যুদ্ধের ধাক্কা, আকাশসীমার নিরাপত্তা ঝুঁকি, রুট পুনর্বিন্যাস এবং বিদেশি এয়ারলাইনগুলোর সতর্ক অবস্থানের কারণে এখন ফ্লাইট সংখ্যা অনেক কম। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক সপ্তাহের অচলাবস্থার পর বিমানবন্দরটিতে কিছু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলেও কার্যক্রম এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে স্বাভাবিক হয়নি।
ইরানের বিমানবন্দর ও এয়ার ন্যাভিগেশন কোম্পানির প্রধান মোহাম্মদ আমিরানি জানিয়েছেন, দেশের পূর্বাঞ্চলীয় আকাশপথকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তবর্তী পূর্ব দিকের রুটগুলো তুলনামূলক নিরাপদ বিবেচনায় অভ্যন্তরীণ ও ট্রানজিট ফ্লাইটের জন্য গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশি এয়ারলাইনগুলোকে ফের আকৃষ্ট করতে রুট ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে ইরান।
তেহরানের দুই প্রধান বিমানবন্দরই খুলেছে
ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ২০ এপ্রিল থেকে তেহরানের প্রধান দুই বিমানবন্দর-ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও মেহরাবাদ বিমানবন্দরে যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। একই বিবৃতিতে জানানো হয়, ইরানের আরও ১০টি বিমানবন্দর থেকে পরবর্তী পর্যায়ে যাত্রীবাহী ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হবে।
ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর মূলত আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের প্রধান কেন্দ্র। অন্যদিকে মেহরাবাদ বিমানবন্দর তেহরানের অভ্যন্তরীণ রুটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যুদ্ধের সময় এই দুই বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইরানের ভেতরে এবং বাইরে যাত্রী চলাচল বড় ধরনের সংকটে পড়ে।
যুদ্ধের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত বিমান অবকাঠামো
ইরানের বিমান খাত শুধু আকাশসীমা বন্ধের কারণে নয়, সরাসরি হামলার কারণেও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩০ মার্চ ভোরে তেহরানের মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাবরিজের একটি পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি বিমান হামলা হয়। ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন তখন জানায়, রাজধানীর আরও কয়েকটি স্থাপনাও হামলার শিকার হয়।
ইরানওয়্যার জানিয়েছে, এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় তেহরান ও উর্মিয়াসহ বেশ কয়েকটি শহরের বিমানবন্দর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের মেহরাবাদ, বাহরাম ও আজমায়েশ বিমানঘাঁটি/বিমানবন্দর এলাকায় হামলার দাবি করে ইসরায়েলি বাহিনী, একই সময়ে উর্মিয়া ও কাশান বিমানবন্দরেও হামলার খবর পাওয়া যায়।
এ ধরনের হামলার কারণে রানওয়ে, বিমান রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা, নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং যাত্রীসেবা ব্যবস্থায় প্রভাব পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে শুধু বিমানবন্দর খুললেই পূর্ণাঙ্গ ফ্লাইট চালু করা সম্ভব নয়, রুট নিরাপত্তা, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, গ্রাউন্ড সার্ভিস এবং বিদেশি এয়ারলাইনগুলোর আস্থা ফিরিয়ে আনাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
যাত্রীদের ভোগান্তি ও আঞ্চলিক প্রভাব
ইরানের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শুধু দেশটির যাত্রীরাই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের বিমান চলাচল ব্যবস্থাও অস্থির হয়ে পড়ে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বড় অংশের আকাশসীমা কয়েক সপ্তাহ ধরে বিঘ্নিত ছিল। এতে হাজার হাজার যাত্রী দেশে ফিরতে বা বিদেশে যেতে সমস্যায় পড়েন। বিভিন্ন দেশ নিজ নাগরিকদের ফেরাতে চার্টার ফ্লাইটের ব্যবস্থা করলেও বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের প্রায় অচলাবস্থা সেই উদ্যোগকেও কঠিন করে তোলে।
যুদ্ধের শুরুর পর কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো কয়েকটি দেশ কয়েক দিনের মধ্যে আংশিকভাবে আকাশসীমা খুলে দিলেও ইরানে হামলা অব্যাহত থাকায় দেশটির বিমান চলাচল স্বাভাবিক হতে বেশি সময় লেগেছে।
জ্বালানি সংকটের চাপও বাড়ছে
ইরানের বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হলেও আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এখনো কাটেনি। হরমুজ প্রণালিতে চলমান অবরোধ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জেট ফুয়েল সরবরাহ নিয়েও চাপ তৈরি হয়েছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, হরমুজ সংকটের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্র থেকে জেট ফুয়েল আমদানির বিকল্প এবং ন্যূনতম রিজার্ভ বাড়ানোর বিষয় বিবেচনা করছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেছেন, সরবরাহ পরিস্থিতি না বদলালে ইউরোপে জেট ফুয়েল সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
জার্মানির লুফথানসা গ্রুপও তেলের দাম বৃদ্ধি ও জেট ফুয়েল ঘাটতির আশঙ্কায় অক্টোবর পর্যন্ত ২০ হাজার স্বল্প দূরত্বের ফ্লাইট কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাভাবিকতায় ফেরা এখনো সময়সাপেক্ষ
ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হওয়া ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ও বাস্তব অগ্রগতি। তবে এটি এখনো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বিমান চলাচলে ফেরার সমান নয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতি, যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব, বিদেশি বিমান সংস্থার সিদ্ধান্ত, বীমা ব্যয়, জ্বালানি সরবরাহ এবং ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দর অবকাঠামো পুনর্গঠন-সবকিছু মিলিয়ে ইরানের বিমান খাতকে ধাপে ধাপে এগোতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পুনরায় শুরু হওয়া ইরানের অর্থনীতি, প্রবাসী যাত্রী, ধর্মীয় ভ্রমণ, চিকিৎসা ভ্রমণ ও বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে আকাশসীমা পুরোপুরি নিরাপদ না হলে এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় রুটগুলো স্বাভাবিক না হলে ফ্লাইট সংখ্যা দ্রুত আগের পর্যায়ে ফেরা কঠিন হবে।
ইরানের প্রধান বিমানবন্দর থেকে আবারও বিমান ওঠানামা শুরু হওয়া তাই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির জন্য স্বস্তির খবর হলেও, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাস্তবতা বলছে-স্বাভাবিকতার পথে যাত্রা এখনো অনিশ্চিত ও ধীর।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা