বাড়ল বিদ্যুতের দাম, বাড়বে জীবনযাত্রার ব্যয়

বাড়ল বিদ্যুতের দাম, বাড়বে জীবনযাত্রার ব্যয়
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির বোঝা কমানোর লক্ষ্যে পাইকারি ও খুচরা-দুই পর্যায়েই বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন ঘোষণায় খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ১ টাকা ৫২ পয়সা এবং পাইকারি পর্যায়ে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯.৮৫ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন বা ট্রান্সমিশন চার্জও ২৩.৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

বুধবার ( ০৩ জুন,২০২৬) রাজধানীর রমনায় বিইআরসি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এ সংক্রান্ত ঘোষণা দেন।  কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি জুন মাস থেকেই নতুন মূল্যহার কার্যকর হবে এবং এ মাসের বিলেই গ্রাহকদের তা পরিশোধ করতে হবে।

 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কেবল মাসিক বিদ্যুৎ বিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্প উৎপাদন, কৃষিখাতে সেচ কার্যক্রম, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও এর কারণে বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা জনগণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

বিইআরসির তথ্য বলছে, বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ৭ টাকা। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে খুচরা পর্যায়ে গড় ইউনিট মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা হয়েছে। একই সঙ্গে সঞ্চালন হুইলিং চার্জ ৩১.৩৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৮.৮৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন, আমদানি ও ক্রয় ব্যয় বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণ খরচ এবং সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে এই নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে। বিইআরসির হিসাব অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ানোর পরও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

 

এর আগে ২০ ও ২১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি খুচরা পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব জমা দেয়। বিপিডিবি ৮৫ পয়সা, আরইবি ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওজোপাডিকো ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো ২ টাকা ৫ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল।

 

মূল্যহার বিশ্লেষণে দেখা যায়, নতুন সিদ্ধান্তে সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী লাইফ লাইন গ্রাহকরা তুলনামূলক বেশি চাপের মুখে পড়বেন। ০ থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী এসব গ্রাহকের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৪.৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে লাইফ লাইন শ্রেণি চালু করা হয়েছিল। প্রচলিত মূল্য কাঠামো অনুযায়ী প্রথম ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়।

 

২০১০ সালের ১ মার্চ লাইফ লাইন গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ছিল ২ টাকা ৫০ পয়সা। ২০২৬ সালের জুনে এসে তা বেড়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। ফলে তাদের মাসিক ব্যয়ে নতুন করে বাড়তি চাপ যুক্ত হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের নতুন মূল্যবৃদ্ধি তাদের পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলবে।

 

নতুন ট্যারিফ অনুযায়ী, ০ থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট মূল্য ৫.২৬ টাকা থেকে ১৭.৪৯ শতাংশ বাড়িয়ে ৬.১৮ টাকা করা হয়েছে। ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের জন্য ৭.২০ টাকা থেকে ১৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৮.৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত ৭.৫৯ টাকা থেকে ১৯.৮৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯.১০ টাকা হয়েছে। ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ৮.০২ টাকা থেকে ১৯.৯৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৯.৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত ১২.৬৭ টাকা থেকে ১৮.৪৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫.০১ টাকা করা হয়েছে। আর ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীদের জন্য ১৪.৬১ টাকা থেকে ১৮.৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে ১৭.৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

একই সঙ্গে সেচ পাম্পে ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৫.২৫ টাকা থেকে ৬.০৪ টাকা করা হয়েছে। ক্ষুদ্র শিল্পের ফ্ল্যাট রেটে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ১০.৭৬ টাকা থেকে ১৮.৩০ শতাংশ বাড়িয়ে ১২.৭৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, অফিস, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ব্যাটারি চার্জিং, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং দাতব্য সংস্থার ক্ষেত্রেও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে।

 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম এ বিষয়ে বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে নিম্ন আয়ের এবং কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবারগুলোর ওপর। বিশেষ করে লাইফ লাইন গ্রাহকদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে যে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছিল, তা কমিয়ে আনার ফলে তাদের বিল তুলনামূলকভাবে বেশি বৃদ্ধি পাবে। তার মতে, লাইফ লাইন ব্যবস্থা মূলত কম ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে চালু হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে সবাই এর সুবিধা পেয়ে আসছিল। এখন ভর্তুকি কমানোর সহজ পন্থা হিসেবে এই শ্রেণির গ্রাহকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।

 

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কেবল বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। একটি পরিবারের মোট জ্বালানি ব্যয়ের মধ্যে রান্নার জ্বালানি, পরিবহন ব্যয় এবং অন্যান্য শক্তিনির্ভর খরচও অন্তর্ভুক্ত থাকে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে এসব খাতেও পরোক্ষ প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

 

অধ্যাপক তামিমের মতে, দেশের শিল্প ও উৎপাদন খাত ব্যাপকভাবে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ভোজ্যতেল, প্লাস্টিক পণ্য এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণসহ প্রায় সব ধরনের শিল্প কার্যক্রমেই বিদ্যুৎ অপরিহার্য। ফলে ধীরে ধীরে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে এবং কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে।

 

কৃষি খাতেও এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন। বর্তমানে দেশের বহু অঞ্চলে সেচব্যবস্থা বিদ্যুতনির্ভর। ফলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সেচ ব্যয় বাড়াবে, যা শেষ পর্যন্ত কৃষি উৎপাদন ব্যয় ও খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। ভর্তুকি কমানোর প্রসঙ্গে অধ্যাপক তামিম বলেন, কেবল মূল্য বৃদ্ধি করেই নয়, উৎপাদন ব্যয় কমিয়েও ভর্তুকির পরিমাণ হ্রাস করা সম্ভব। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার অদক্ষতা, উৎপাদন খরচ কমানোর সুযোগ এবং খাতটির প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে আগে গুরুত্বসহকারে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

 

নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়ে তিনি বলেন, তেলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ধীরে ধীরে কমিয়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো উচিত। শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস এবং বড় ছাদসমৃদ্ধ স্থাপনাগুলোতে রুফটপ সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, জ্বালানি আমদানির ব্যয় হ্রাস পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও কমানো সম্ভব হবে।

 

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। ফলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প, কৃষি, পরিবহন এবং গৃহস্থালি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে, যার চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়বে ভোক্তাদের ওপর। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

তিনি আরও বলেন, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, সিস্টেম লস ও ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। তার মতে, দুই দফা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বিদ্যুতের নতুন দাম সাধারণ মানুষ, শিল্পখাত ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ