এল নিনোর প্রভাব: দেশে নতুন মহামারি ও অজানা ভাইরাসের শঙ্কা!

এল নিনোর প্রভাব: দেশে নতুন মহামারি ও অজানা ভাইরাসের শঙ্কা!
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

রেকর্ড ভাঙা দাবদাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা এবং ঋতুচক্রের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘এল নিনো’। জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতা থেকে সৃষ্টি হওয়া এই বৈশ্বিক আবহাওয়া প্রক্রিয়া শুধু তাপমাত্রা বাড়ায় না, বরং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ত্বরান্বিত করে। আর বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে এর প্রভাব কেবল পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে আগামী মাসগুলোতে নতুন এল নিনো গঠনের সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর প্রভাব আগের তুলনায় আরও তীব্র হতে পারে। এর ফলে এশিয়াজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, আকস্মিক বন্যা এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়তে পারে।

 

বাংলাদেশে এর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা যেতে পারে জনস্বাস্থ্যে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, কিডনি জটিলতা, হৃদরোগজনিত ঝুঁকি এবং শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবেন। গবেষণাগুলো দেখিয়েছে, এল নিনো-সংশ্লিষ্ট তাপপ্রবাহ স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং মৃত্যুহারও বাড়িয়ে দিতে পারে।

 

একই সঙ্গে অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা মশাবাহিত রোগের বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সতর্ক করেছে যে এল নিনো পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা এবং অন্যান্য ভেক্টর-বাহিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ডেঙ্গু বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রোগটির বিস্তার নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।

 

শুধু ডেঙ্গুই নয়, বন্যা ও দূষিত পানির কারণে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস-এ এবং অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। WHO-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এল নিনো-সংশ্লিষ্ট বন্যা ও জলাবদ্ধতা আক্রান্ত অঞ্চলে কলেরা ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।

 

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উদ্বেগ আরও গভীর। আইসিডিডিআর,বি এবং আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো বহু বছর ধরেই দেখিয়ে আসছে যে এল নিনো ও কলেরা সংক্রমণের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। অতীতে এল নিনো বছরের পর বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে কলেরার প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছিল।

 

বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ভবিষ্যতের অজানা রোগ নিয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাণী, পোকামাকড়, ভাইরাস ও রোগজীবাণুর স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান বদলে যাচ্ছে। নতুন পরিবেশে কিছু জীবাণু নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে, আবার কিছু রোগের সংক্রমণ ক্ষমতাও বাড়তে পারে। যদিও কোনো নির্দিষ্ট নতুন ভাইরাসের আগমন নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন চরম জলবায়ুগত পরিবর্তন নতুন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

 

পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ মো. শামসুদ্দোহার মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের ধরণ পরিবর্তনের সঙ্গে রোগের সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশে আরও গভীর গবেষণা প্রয়োজন। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, করোনা মহামারি বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে একটি নতুন রোগ কত দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে। ফলে জলবায়ু ও স্বাস্থ্যকে এখন আর আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাপপ্রবাহকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ডেঙ্গু ও পানিবাহিত রোগ পর্যবেক্ষণ জোরদার করা, হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি বাড়ানো এবং জলবায়ু-স্বাস্থ্য গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের জন্য বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ