{{ news.section.title }}
জুয়া ঠেকাতে কঠোর আইন, নজরদারি ও গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের
অনলাইন ও অফলাইন জুয়া এবং বেটিং–সংশ্লিষ্ট অপরাধ দমনে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ শিরোনামের প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় তদন্তকারী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে এই ক্ষমতার পরিধি, ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের বিধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রযুক্তিবিদ, মানবাধিকারকর্মী ও সুশাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।
খসড়া আইনের ৩৯ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা যদি ‘যুক্তিসংগত কারণে বিশ্বাস’ করেন যে জুয়াসংক্রান্ত কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বা হচ্ছে, তাহলে তিনি আদালতের পরোয়ানা ছাড়াই প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেপ্তারের মতো পদক্ষেপ নিতে পারবেন। এ ক্ষমতা প্রয়োগের আওতায় থাকবেন পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, সিআইডি, র্যাব, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং সরকার মনোনীত অন্যান্য কর্মকর্তারা।
তল্লাশি অভিযানের সময় কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, সিম কার্ড, ব্যাংক হিসাবের তথ্য, মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) হিসাব, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন রেকর্ড এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য জব্দ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ধরনের বিধান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তাঁর মতে, অনলাইন ও অফলাইন জুয়া এবং বেটিং–সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, "জুয়া বা বেটিং নিয়ন্ত্রণের নামে এ ধরনের বিধান কার্যকর হলে নজরদারিনির্ভর রাষ্ট্রীয় কাঠামো আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।"
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, খসড়ায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ‘বিশ্বাসের’ ভিত্তিতে কোনো ধরনের কার্যকর সুরক্ষা বা জবাবদিহির ব্যবস্থা ছাড়াই ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারকারীর মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। তাঁর মতে, সংসদে উত্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর সংশোধন এবং অংশীজনদের অংশগ্রহণে বিস্তৃত পর্যালোচনা প্রয়োজন।
এআই নজরদারি ও ডিপিআই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব
প্রস্তাবিত আইনের ৪৭ ধারায় সরকারকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) মনিটরিং সিস্টেম, ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন (ডিপিআই), রিস্ক স্কোরিং সিস্টেম এবং ট্রানজেকশন মনিটরিং প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
"আইনের খসড়ার ৪৭ ধারায় সরকারকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) মনিটরিং সিস্টেম, ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন (ডিপিআই), রিস্ক স্কোরিং সিস্টেম এবং ট্রানজেকশন মনিটরিং প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্দেহজনক ওয়েবসাইট, অ্যাপ, ডিভাইস, ডিজিটাল ওয়ালেট, আর্থিক হিসাব কিংবা লেনদেন শনাক্ত করা যাবে।"
এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক বি এম মইনুল হোসেন। তাঁর ভাষায়, "বিশেষ পরিস্থিতিতে নাগরিক অধিকার তো সরকারই ক্ষুণ্ন করে। তাহলে সরকারকে নজরদারিতে রাখবে কে?"
রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, খসড়ায় ‘বিশ্বাসের’ ভিত্তিতে তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নাগরিক অধিকার সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। একজন সাধারণ নাগরিক কীভাবে নিশ্চিত হবেন যে তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য ও ডিজিটাল যোগাযোগ কেবল জুয়া প্রতিরোধের জন্যই পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়-সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা প্রসঙ্গে মইনুল হোসেন বলেন, বিশ্বজুড়ে এখন এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘হিউম্যান ইন্টারজেকশন’ বা মানবীয় তদারকির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। শুধু প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করা নিরাপদ নয়।
মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ
অনলাইন ও অফলাইন জুয়া এবং বেটিং–সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও কয়েকটি ধারা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি)। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, অপরাধ দমনের লক্ষ্য নিয়ে তৈরি কোনো আইন এমন হওয়া উচিত নয়, যা ভবিষ্যতে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা এবং বিচারিক সুরক্ষাকে সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
সব অপরাধকে অজামিনযোগ্য করার প্রস্তাব
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, জুয়া প্রতিরোধে বর্তমানে কার্যকর ১৮৬৭ সালের আইন ডিজিটাল যুগের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চ্যুয়াল ক্যাসিনো, ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক লেনদেন, ভুয়া সিম ব্যবহার এবং ডিজিটাল আর্থিক জালিয়াতির মতো আধুনিক অপরাধ মোকাবিলায় পুরোনো আইন পর্যাপ্ত নয় বলেই নতুন আইনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খসড়ার ৩৭ ধারায় আইনের আওতাভুক্ত সব অপরাধকে আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য এবং আপস-অযোগ্য হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে অভিযোগ পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি তদন্ত শুরু করতে পারবে এবং জামিন পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে যেতে পারে।
‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট’ গঠনের পরিকল্পনা
প্রস্তাবিত আইনের ৪৩ ধারায় ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট’ নামে একটি তথ্যভান্ডার তৈরির কথা বলা হয়েছে।
"আইনের খসড়ার ৪৩ ধারায় ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট’ গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই তালিকায় একজন তালিকাভুক্ত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল নম্বর, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব, ডিজিটাল ওয়ালেট, ব্যবহৃত ডিভাইস, ডোমেইন নাম, আইপি ঠিকানা, ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে।"
তবে কাউকে কী প্রক্রিয়ায় এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, কতদিন তথ্য সংরক্ষিত থাকবে কিংবা ভুলবশত অন্তর্ভুক্ত হলে কীভাবে নাম প্রত্যাহার করা যাবে-এসব বিষয়ে খসড়ায় সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
এ ছাড়া ৪৪ ধারায় জাতীয় পরিচয়পত্র, সিম, মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস), ডিজিটাল ওয়ালেট এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্যকে সমন্বিতভাবে যাচাইয়ের জন্য এনআইডি–সিম–এমএফএস–লিংকিং সিস্টেম বাস্তবায়নের বিধান রাখা হয়েছে। একই ধারায় বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন এবং ফেশিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্য সুরক্ষা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড
খসড়া আইনে অপরাধের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অনলাইন জুয়া বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক বা বিদেশি সার্ভারের মাধ্যমে একই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে শাস্তি বেড়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ কোটি টাকা জরিমানায় উন্নীত হবে।
অনলাইন বেটিংয়ের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে জুয়ার অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সি বা অন্য কোনো মাধ্যমে পাচার করলে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে, যা খসড়া আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, নতুন আইনের কিছু ধারা বিদ্যমান সাইবার সুরক্ষা আইন এবং ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, খসড়ায় তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে ডিজিটাল সিস্টেম এবং ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর ব্যাপক প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে, যা ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইনের কিছু বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
তাঁর মতে, জুয়া প্রতিরোধে বিদ্যমান অন্যান্য আইন এবং নতুন আইনের মধ্যে কোনটি প্রাধান্য পাবে, সে বিষয়েও আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, "প্রস্তাবিত আইনটি অত্যন্ত কঠোর। এ অবস্থায় পাস হলে ভবিষ্যতে এর অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, জুয়া ও বেটিং নিয়ন্ত্রণে আধুনিক ও কার্যকর আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি হলেও বর্তমান খসড়ায় নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং তদন্ত ক্ষমতা বৃদ্ধির যেসব বিধান রাখা হয়েছে, সেগুলো নাগরিক অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, খসড়াটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। অংশীজনদের মতামত ও আলোচনার ভিত্তিতে আইনটির চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণ করা হবে।