যে ১০ প্রস্তাবে সাজানো হয়েছে বাজেট ২০২৬-২৭

যে ১০ প্রস্তাবে সাজানো হয়েছে বাজেট ২০২৬-২৭
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ১০টি প্রধান অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নতুন জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্য উপস্থাপনকালে তিনি বলেন, দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ, বিনিয়োগ পরিবেশ, কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে এবারের বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে।

 

‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

 

অর্থমন্ত্রী জানান, এবারের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা যেখানে উন্নয়নের সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছাবে। বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং প্রশাসনিক সংস্কারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

তিনি বলেন, তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা হবে। একই সঙ্গে সকল নাগরিকের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাকে সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

 

অর্থমন্ত্রী বলেন, এবারের বাজেট ১০টি প্রধান অগ্রাধিকারের ওপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করা হয়েছে। সেগুলো হলো-

 

১. সবার জন্য উন্নয়ন: দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, সব খাত এবং সব অঞ্চলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা, যাতে উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে যায়।

২. সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: বাস্তবমুখী, দক্ষতাভিত্তিক ও মূল্যবোধনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে যোগ্য মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে সকল নাগরিকের জন্য মানসম্মত ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করা।

৩. সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা: শিশু, নারী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধীসহ সব বয়স ও শ্রেণির মানুষের জন্য জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা।

৪. বিনিয়োগ-নির্ভর, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি: পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা। পাশাপাশি কৃষিকে উৎপাদন, জীবিকা ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার কৌশলগত খাত হিসেবে আরও শক্তিশালী করা।

৫. বিনিয়ন্ত্রণকরণ এবং সাশ্রয়ী ও সহজিকৃত ব্যবসা পরিবেশ: সরকারি কাজে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও বিলম্ব কমিয়ে স্বচ্ছ, সহজ, আধুনিক এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, যাতে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য আরও গতিশীল হয়।

৬. আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে পুঁজিবাজার সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব আর্থিক কাঠামো তৈরি করা।

৭. জ্বালানি নিরাপত্তা: উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তোলা।

৮. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ: প্রযুক্তিগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, উদ্ভাবননির্ভর ও ভবিষ্যতমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং দেশকে বিশ্বের অন্যতম আইসিটি রপ্তানিকারক রাষ্ট্রে পরিণত করা।

৯. প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জনগণের অংশগ্রহণে বনায়নকে সবুজ বিপ্লবে রূপান্তর, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করা, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালুর মাধ্যমে টেকসই ও বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ নির্মাণ।

১০. স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা: মেধাভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা, সরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা নিশ্চিত করা।

 

প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে সরকার।

বাজেটে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ