সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একাধিক সুখবর

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একাধিক সুখবর
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

সরকারি চাকরিজীবীদের অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০১৫ সালে দেশের পেনশন ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজ্ঞাপন জারি করে, যার মাধ্যমে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল, পেনশনের হার, আনুতোষিক (গ্র্যাচুইটি), পারিবারিক পেনশন, অব্যবহৃত ছুটি নগদায়ন এবং মৃত্যুজনিত আর্থিক সুবিধাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, স্বাধীনতার পর সরকারি পেনশন ব্যবস্থায় এটি ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। এর ফলে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং চাকরিজীবী অবস্থাতেই কর্মচারীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে আস্থা বেড়েছে।

 

পেনশন পাওয়ার শর্তে বড় পরিবর্তন

সংস্কারের আগে পেনশন পাওয়ার জন্য একজন সরকারি কর্মচারীকে ন্যূনতম ১০ বছর চাকরি করতে হতো। ২০১৫ সালের প্রজ্ঞাপনে সেই শর্ত শিথিল করে ন্যূনতম চাকরিকাল ৫ বছর নির্ধারণ করা হয়। এটি বিশেষ করে তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যারা চাকরিজীবনের মাঝপথে মৃত্যু, স্থায়ী অক্ষমতা অথবা প্রশাসনিক কারণে চাকরি হারানোর মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

 

একই সঙ্গে সর্বোচ্চ পেনশনের হারও বাড়ানো হয়। আগে অবসরের সময় সর্বশেষ প্রাপ্ত মূল বেতনের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন পাওয়া যেত। নতুন বিধানে তা বাড়িয়ে ৯০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। ফলে দীর্ঘ সময় সরকারি চাকরিতে কর্মরত কর্মকর্তারা অবসরের পর আগের তুলনায় বেশি আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ লাভ করেন।

 

চাকরিকালভিত্তিক নতুন পেনশন কাঠামো

নতুন বিধান অনুযায়ী চাকরিকালের ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে পেনশনের হার নির্ধারণ করা হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ৫ বছর চাকরি পূর্ণ হলে শেষ প্রাপ্ত মূল বেতনের ২১ শতাংশ পেনশন পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়। এরপর চাকরিকাল বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পেনশনের হারও বাড়তে থাকে।

 

২৫ বছর বা তার বেশি চাকরিকাল পূর্ণ হলে একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ হারে পেনশন পাওয়ার যোগ্য হন। তবে ৫ থেকে ২৪ বছর চাকরিকালের ক্ষেত্রে নির্ধারিত পেনশন সুবিধা মূলত বিশেষ পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য। যেমন-চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যু, স্থায়ী অক্ষমতা, কিংবা পদ বিলুপ্তির কারণে চাকরি হারানোর ক্ষেত্রে এসব সুবিধা কার্যকর হবে।

 

অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন বৃদ্ধি

২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে সরকার বিদ্যমান পেনশনভোগীদের জন্যও অতিরিক্ত সুবিধা ঘোষণা করে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৬৫ বছরের কম বয়সী পেনশনভোগীদের পেনশন ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। অন্যদিকে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে পেনশন বৃদ্ধি করা হয় ৫০ শতাংশ। এ ছাড়া দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মাসিক ন্যূনতম পেনশন ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়, যাতে নিম্ন আয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরাও ন্যূনতম আর্থিক সুরক্ষা পান। তৎকালীন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতা বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

 

আনুতোষিক বা গ্র্যাচুইটি হিসাবেও পরিবর্তন

পেনশনযোগ্য চাকরিকাল ৫ বছরে নামিয়ে আনার কারণে আনুতোষিকের হিসাবেও পরিবর্তন আনা হয়। নতুন বিধান অনুযায়ী, ৫ থেকে ৯ বছর চাকরিকালের ক্ষেত্রে প্রতি ১ টাকা পেনশনের বিপরীতে ২৬৫ টাকা আনুতোষিক নির্ধারণ করা হয়।

এর ফলে তুলনামূলক কম চাকরিকাল সম্পন্ন করা কর্মচারীরাও অবসরের সময় এককালীন উল্লেখযোগ্য অর্থ পাওয়ার সুযোগ লাভ করেন। অর্থ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছে, যা অবসরের পর আর্থিক চাপ কমাতে সহায়তা করে।

 

মৃত্যু বা স্থায়ী অক্ষমতার ক্ষেত্রে বিশেষ আর্থিক সহায়তা

সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যু বা স্থায়ী অক্ষমতার ক্ষেত্রে পরিবারকে বাড়তি সুরক্ষা দেওয়া। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী ৫ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করলে অথবা স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারালে তার পরিবার বিশেষ আর্থিক সহায়তা পাবে। এ ক্ষেত্রে চাকরিকালের প্রতিটি পূর্ণ বছরের জন্য শেষ তিন মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ এককালীন সহায়তা হিসেবে প্রদান করা হবে। নীতিনির্ধারকদের মতে, এটি সরকারি চাকরিজীবীদের পরিবারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

 

পারিবারিক পেনশনে নতুন সুযোগ

২০১৫ সালের সংস্কারে পারিবারিক পেনশন ব্যবস্থায়ও বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়। আগে বিধবা স্ত্রীকে নির্দিষ্ট বয়সের পর পুনর্বিবাহ না করার অঙ্গীকারনামা দিতে হতো। নতুন বিধানে সেই শর্ত শিথিল করা হয়। এ ছাড়া নারী সরকারি কর্মচারীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামীও নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে পারিবারিক পেনশন পাওয়ার অধিকারী হবেন বলে উল্লেখ করা হয়। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

 

অব্যবহৃত ছুটি নগদায়নে বড় সুবিধা

পেনশন সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল অব্যবহৃত ছুটি নগদায়নের সুবিধা বৃদ্ধি। আগের নিয়ম অনুযায়ী একজন সরকারি কর্মচারী সর্বোচ্চ ১২ মাসের অব্যবহৃত ছুটি নগদায়ন করতে পারতেন। নতুন বিধানে সেই সীমা বাড়িয়ে ১৮ মাস করা হয়। ফলে দীর্ঘদিন চাকরিরত থেকে ছুটি কম ব্যবহার করা কর্মচারীরা অবসরের সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার সুযোগ লাভ করেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সুবিধা অবসরের পরপরই নতুন জীবন শুরু করার ক্ষেত্রে অনেকের জন্য আর্থিক সহায়তা হিসেবে কাজ করে।

 

২০১৫ সালের জুলাই থেকে কার্যকর

অর্থ বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনটি ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর বলে গণ্য করা হয়। শুধু চাকরিতে কর্মরত ব্যক্তিরাই নয়, ওই সময়ে যারা অবসর-পূর্ব ছুটিতে (পিআরএল) ছিলেন, তাদেরও নতুন সুবিধার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ফলে হাজার হাজার সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী সরাসরি এই সংস্কারের সুফল পান।

 

সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পেনশন শুধু অবসরকালীন আয় নয়, বরং এটি সামাজিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৫ সালের এই সংস্কারের মাধ্যমে একদিকে যেমন পেনশন সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে, অন্যদিকে মৃত্যু, অক্ষমতা ও পারিবারিক সুরক্ষার বিষয়গুলোও শক্তিশালী করা হয়েছে।

 

বর্তমানে দেশে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালুর উদ্যোগের মধ্যেও সরকারি পেনশন ব্যবস্থা এখনো সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবসরকালীন সুরক্ষা কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, চাকরিকাল কমিয়েও পেনশনের সুযোগ, পেনশনের হার বৃদ্ধি, পারিবারিক পেনশনে নতুন সুবিধা, মৃত্যুজনিত আর্থিক সহায়তা এবং অব্যবহৃত ছুটি নগদায়নের সুযোগ বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপগুলো সরকারি কর্মচারীদের কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।


সম্পর্কিত নিউজ