পে-স্কেলে সুখবর, বাড়তি বেতন পাবেন যেদিন থেকে

পে-স্কেলে সুখবর, বাড়তি বেতন পাবেন যেদিন থেকে
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নবম পে-স্কেল আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগায় বর্ধিত বেতনের অর্থ হাতে পেতে অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।

নতুন বেতন কাঠামোয় মূল বেতন সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। তবে বর্তমানে চালু থাকা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ‘বিশেষ সুবিধা’ বা ইনসেনটিভ বাতিল করা হবে। ফলে ঘোষিত বেতন বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য হলেও প্রকৃত বা নিট বেতন বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম হতে পারে।

 

বহুল আলোচিত এই নবম পে-স্কেল জুলাই থেকেই কার্যকর হলেও এর আর্থিক সুবিধা বাস্তবে পেতে সরকারি চাকরিজীবীদের আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে।

 

তবে এ বিষয়ে বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়গুলো নিয়ে আরও পর্যালোচনার জন্য আগামী ২৪ জুন সচিব কমিটির আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। নবম পে-স্কেল দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ওই বৈঠকের পরও ধারাবাহিকভাবে আরও কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

 

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে পুনর্গঠিত সচিব কমিটির বৈঠকে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ, সচিব কমিটির পর্যবেক্ষণ, জুডিসিয়াল সার্ভিস পে-কমিশনের প্রস্তাব এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়।

 

বৈঠকে প্রাথমিকভাবে আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন শুরু করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়। জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি একবারে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

 

প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিচার বিভাগের সদস্য এবং বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা নতুন নির্ধারিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ সুবিধা পাবেন। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ মূল বেতন কার্যকর করা হবে। আর তৃতীয় ধাপে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, নতুন বেতন কাঠামো আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হলেও বাড়তি অর্থ সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে পৌঁছাতে অক্টোবর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। কারণ বাস্তবায়ন কৌশল চূড়ান্ত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হবে।

 

এর আগে, গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

 

প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে কর্মকর্তাদের বেতনের জন্য ১৪ হাজার ৪ কোটি টাকা, কর্মচারীদের বেতনের জন্য ৩০ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন ভাতা প্রদানের জন্য ৪৫ হাজার ১২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

 

এ ছাড়া জনপ্রশাসন খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৫৫ কোটি টাকা বৃদ্ধি করে আগামী অর্থবছরের জন্য ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর একটি বড় অংশ থোক বরাদ্দ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, যেখান থেকে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা নবম পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়নে ব্যয় হতে পারে।

 

বেতন কমিশনের সুপারিশে যা রয়েছে

সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২১ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেয়।

 

প্রতিবেদন প্রণয়নের আগে কমিশন একটি অনলাইন জরিপ পরিচালনা করে, যেখানে প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ অংশ নিয়ে মতামত দেন। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, জীবনমান এবং সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সুপারিশমালা প্রস্তুত করা হয়।

 

কমিশনের সুপারিশে সরকারি চাকরিজীবীদের বৈশাখী ভাতা বর্তমান ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমানে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য চালু থাকা যাতায়াত ভাতা ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

 

বাড়িভাড়া ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। কমিশন প্রথম থেকে ১০ম গ্রেডের চাকরিজীবীদের জন্য তুলনামূলক কম হারে এবং ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি হারে বাড়িভাড়া ভাতা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে।

 

বেতন কাঠামোর প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। দ্বিতীয় গ্রেডের বেতন ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা এবং তৃতীয় গ্রেডের বেতন ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার টাকার মধ্যে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

 

বেতন কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, চতুর্থ গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। পঞ্চম গ্রেডের বেতন ৮৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ টাকা এবং ষষ্ঠ গ্রেডের বেতন ৭১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।

 

এ ছাড়া সপ্তম গ্রেডের বেতন ৫৮ হাজার থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার ৮০০ টাকা, অষ্টম গ্রেডের বেতন ৪৭ হাজার ২০০ থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টাকা, নবম গ্রেডের বেতন ৪৫ হাজার ১০০ থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৮০০ টাকা এবং দশম গ্রেডের বেতন ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

 

প্রস্তাবিত কাঠামোতে একাদশ গ্রেডের বেতন ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা, দ্বাদশ গ্রেডের ২৪ হাজার ৩০০ থেকে ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা এবং ত্রয়োদশ গ্রেডের ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

 

একইভাবে চতুর্দশ গ্রেডের বেতন ২৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫৬ হাজার ৮০০ টাকা, পঞ্চদশ গ্রেডের ২২ হাজার ৮০০ থেকে ৫৫ হাজার ২০০ টাকা, ষোড়শ গ্রেডের ২১ হাজার ৯০০ থেকে ৫২ হাজার ৯০০ টাকা এবং সপ্তদশ গ্রেডের বেতন ২১ হাজার ৪০০ থেকে ৫১ হাজার ৯০০ টাকা করার সুপারিশ করেছে কমিশন।

 

এ ছাড়া অষ্টাদশ গ্রেডের বেতন ২১ হাজার থেকে ৫০ হাজার ৯০০ টাকা, উনবিংশ গ্রেডের বেতন ২০ হাজার ৫০০ থেকে ৪৯ হাজার ৬০০ টাকা এবং বিংশ গ্রেডের মূল বেতন ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ