স্বর্ণের ক্যারেট কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং কেনার আগে যা জানা জরুরি

স্বর্ণের ক্যারেট কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং কেনার আগে যা জানা জরুরি
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

স্বর্ণ শুধু অলংকারের ধাতু নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপদ বিনিয়োগ ও সম্পদ সংরক্ষণের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বর্ণের গহনার চাহিদা সবসময়ই বেশি। তবে স্বর্ণ কেনার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো এর ক্যারেট বা বিশুদ্ধতার মাত্রা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা।

অনেক ক্রেতা দাম, ডিজাইন বা ওজনের দিকে নজর দিলেও স্বর্ণের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন থাকেন না। ফলে অনেক সময় তারা প্রতারিত হন কিংবা প্রত্যাশিত মানের গহনা পান না।

 

গহনা তৈরিতে সাধারণত শতভাগ খাঁটি স্বর্ণ ব্যবহার করা হয় না। কারণ ২৪ ক্যারেট স্বর্ণ অত্যন্ত নরম হওয়ায় তা সহজেই বাঁকতে বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এজন্য গহনা তৈরির সময় স্বর্ণের সঙ্গে তামা, রুপা, দস্তা, নিকেল বা অন্যান্য ধাতু মিশিয়ে সংকর ধাতু বা অ্যালয় তৈরি করা হয়। এতে গহনা শক্ত হয় এবং দীর্ঘদিন ব্যবহার উপযোগী থাকে।

 

বিশ্বব্যাপী স্বর্ণের বিশুদ্ধতা পরিমাপের সবচেয়ে প্রচলিত একক হলো ক্যারেট (K বা Kt)। এটি ২৪ ভিত্তিক একটি স্কেল। ২৪ ক্যারেট স্বর্ণে প্রায় ৯৯.৯ শতাংশ খাঁটি স্বর্ণ থাকে। ২২ ক্যারেট স্বর্ণে থাকে প্রায় ৯১.৬ শতাংশ, ২১ ক্যারেটে ৮৭.৫ শতাংশ, ১৮ ক্যারেটে ৭৫ শতাংশ, ১৪ ক্যারেটে ৫৮.৩ শতাংশ এবং ১০ ক্যারেটে প্রায় ৪১.৭ শতাংশ খাঁটি স্বর্ণ থাকে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে গহনা তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ২২ ক্যারেট ও ২১ ক্যারেট স্বর্ণ। অন্যদিকে ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ তুলনামূলকভাবে বেশি টেকসই হওয়ায় আধুনিক ডিজাইনের গহনায় এর ব্যবহারও বাড়ছে।

 

গহনার ক্যারেট নির্ধারণের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো গহনার গায়ে থাকা স্ট্যাম্প বা হলমার্ক পরীক্ষা করা। সাধারণত আংটির ভেতরের অংশ, চেইনের লক বা ব্রেসলেটের অদৃশ্য স্থানে এই চিহ্ন থাকে। ১০K, ১৪K, ১৮K, ২১K এবং ২২K চিহ্ন সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

 

অনেক দেশে ক্যারেটের পরিবর্তে ‘পার্টস পার থাউজ্যান্ড’ পদ্ধতিতে স্বর্ণের বিশুদ্ধতা প্রকাশ করা হয়। সেখানে তিন অঙ্কের সংখ্যার মাধ্যমে বিশুদ্ধতার মাত্রা উল্লেখ করা হয়। যেমন-

৯৯৯ = ২৪ ক্যারেট

৯১৬ = ২২ ক্যারেট

৮৭৫ = ২১ ক্যারেট

৮৩৩ = ২০ ক্যারেট

৭৫০ = ১৮ ক্যারেট

৫৮৩ = ১৪ ক্যারেট

৪১৭ = ১০ ক্যারেট

অর্থাৎ কোনো গহনায় যদি ৭৫০ লেখা থাকে, তাহলে বুঝতে হবে এতে ৭৫ শতাংশ খাঁটি স্বর্ণ রয়েছে, যা ১৮ ক্যারেটের সমান।

 

গহনায় অনেক সময় ‘KP’ বা ‘P’ চিহ্নও দেখা যায়। এটি ‘প্লাম্ব’ নির্দেশ করে। এর অর্থ হলো গহনাটিতে স্ট্যাম্পে উল্লেখিত ক্যারেটের চেয়ে কম স্বর্ণ নেই। উদাহরণস্বরূপ, ২০KP লেখা থাকলে সেটিতে অন্তত ২০ ক্যারেট স্বর্ণ রয়েছে।

 

স্বর্ণের গহনায় বর্তমানে হলমার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। হলমার্ক হলো অনুমোদিত পরীক্ষাগারে যাচাই করা বিশুদ্ধতার সরকারি বা স্বীকৃত সনদ। বাংলাদেশেও স্বর্ণের গহনায় হলমার্কিং বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ক্রেতারা গহনার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন এবং প্রতারণার ঝুঁকি কমে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বর্ণ কেনার সময় শুধু ক্যারেট নয়, আরও কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে গহনার ওজন, মেকিং চার্জ, ভ্যাট, হলমার্ক এবং বিক্রয় রসিদ। অনেক সময় কম দামের লোভে নিম্নমানের গহনা কিনে পরে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।

 

এছাড়া পুরোনো স্বর্ণ বিক্রি বা পরিবর্তনের সময়ও ক্যারেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ গহনার বিশুদ্ধতা যত বেশি হবে, পুনর্বিক্রয় মূল্যও তত বেশি পাওয়া যায়। অন্যদিকে কম ক্যারেটের গহনার বাজারমূল্য তুলনামূলক কম হয়।

 

যেসব গহনায় কোনো ধরনের স্ট্যাম্প বা হলমার্ক থাকে না, সেগুলোর বিশুদ্ধতা নির্ধারণে জুয়েলাররা সাধারণত অ্যাসিড টেস্ট, এক্স-রে ফ্লুরোসেন্স (XRF) পরীক্ষা বা অন্যান্য আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে স্বর্ণের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণ কেনার আগে ক্যারেট বা বিশুদ্ধতার মাত্রা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি গহনার মান, স্থায়িত্ব, ব্যবহারযোগ্যতা এবং বাজারমূল্য মূলত নির্ভর করে এতে থাকা খাঁটি স্বর্ণের পরিমাণের ওপর। তাই স্বর্ণ কেনার সময় কেবল ডিজাইন বা দামের দিকে না তাকিয়ে এর বিশুদ্ধতা, হলমার্ক এবং বিক্রয় সনদ নিশ্চিত করা উচিত। এতে যেমন অর্থের সঠিক মূল্য পাওয়া যায়, তেমনি ভবিষ্যতে বিক্রি বা বিনিময়ের ক্ষেত্রেও বাড়তি সুবিধা মেলে।


সম্পর্কিত নিউজ