নতুন রাডারে নজরদারিতে পুরো আকাশসীমা, বাড়বে বাংলাদেশের রাজস্ব

নতুন রাডারে নজরদারিতে পুরো আকাশসীমা, বাড়বে বাংলাদেশের রাজস্ব
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

বাংলাদেশের আকাশপথ ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আধুনিক এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সেন্টার বা এটিএমসি চালুর মাধ্যমে দেশের আকাশসীমা এখন আরও বিস্তৃত ও রিয়েল-টাইম নজরদারির আওতায় এসেছে। ফ্রান্সভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থ্যালেসের সহায়তায় স্থাপিত এই আধুনিক সিএনএস-এটিএম ব্যবস্থার মাধ্যমে শুধু বিমান চলাচলের নিরাপত্তা বাড়বে না, বরং বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী বিদেশি উড়োজাহাজ থেকে রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতাও বাড়বে বলে আশা করছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ-বেবিচক।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার সকালে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম নতুন এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সেন্টার উদ্বোধন করেন। বেবিচক জানিয়েছে, থ্যালেসের প্রযুক্তি সহায়তায় বাস্তবায়িত এই ব্যবস্থার ফলে ফ্লাইটের নির্ভুলতা, সময়ানুবর্তিতা, আকাশসীমার ধারণক্ষমতা এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সংস্থাটির মতে, নতুন ব্যবস্থা বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও ভূমিকা রাখবে এবং বাংলাদেশের আকাশসীমার কৌশলগত গুরুত্ব বাড়াবে।

আধুনিক এই এটিএমসি দেশের পুরো আকাশসীমা রিয়েল-টাইম নজরদারির আওতায় আনছে। বেবিচক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করা প্রতিটি ফ্লাইট এখন আরও কার্যকরভাবে শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। প্রকল্পটির পরিকল্পনা শুরু হয় ২০১৯ সালে এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হয়। বেবিচক সূত্রের বরাতে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, প্রকল্পটির ব্যয় হয়েছে ৯৪২ কোটি টাকা।

 

পুরনো ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা

বহু বছর ধরে দেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থাপনা পুরনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বেবিচকের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সদস্য এয়ার কমোডর নূর-ই-আলম বলেন, আগের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থা ছিল প্রায় ৪০ বছরের পুরনো এবং রাডার ব্যবস্থাও ছিল প্রায় ৩৫ বছরের পুরনো। পুরনো ব্যবস্থায় বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে চলাচলকারী সব উড়োজাহাজ কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন ছিল। নতুন সিস্টেম সেই দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা কাটাতে সাহায্য করবে।

 

বাংলাদেশ মনিটরের ২০২১ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সে সময়কার ৩৭ বছরের পুরনো অ্যানালগ রাডার সমুদ্রের ওপর দিয়ে চলা বিদেশি উড়োজাহাজ শনাক্ত করতে পারত না। ফলে বাংলাদেশের পুরো সামুদ্রিক আকাশসীমা কাভার করা সম্ভব হচ্ছিল না এবং ওই আকাশসীমা ব্যবহারকারী উড়োজাহাজ থেকে প্রাপ্য চার্জ আদায়েও সীমাবদ্ধতা ছিল। নতুন রাডার স্থাপনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল পুরো সামুদ্রিক এলাকা কাভার করে নিরাপত্তা ও রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো।

 

থ্যালেস প্রযুক্তি ও সিএনএস-এটিএম ব্যবস্থা

নতুন ব্যবস্থাটি যোগাযোগ, নেভিগেশন, নজরদারি এবং এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট-অর্থাৎ সিএনএস-এটিএম ক্যাটাগরির আধুনিক সমাধান। ২০২১ সালে বেবিচক ও থ্যালেসের মধ্যে চুক্তি হয়। ওই সময় বাংলাদেশ মনিটর জানায়, চুক্তির আওতায় রাডারসহ নেভিগেশন ও সারভেইলেন্স সিস্টেম এবং সংশ্লিষ্ট এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সরঞ্জাম সরবরাহ, স্থাপন ও পরিচালনার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

দ্য ডেইলি স্টারের তথ্য অনুযায়ী, নতুন রাডার ঢাকা থেকে ৩৫০ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়োজাহাজ শনাক্ত করতে পারে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের রাডার এখন এই সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বেবিচক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরে ৪৫০ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ৮৩৩ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত ফ্লাইটের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে। এর ফলে গভীর সমুদ্রের আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যতে আরও বেশি রাজস্ব আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

 

ওভারফ্লাইং চার্জে আয় বাড়ার সম্ভাবনা

নতুন রাডার চালুর ফলে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী বিদেশি ফ্লাইট শনাক্ত, পর্যবেক্ষণ এবং বিলিং প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে। ডেইলি মেসেঞ্জারের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পুরনো রাডার ও নেভিগেশন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের আকাশসীমা ও বঙ্গোপসাগরের বড় অংশ ঠিকভাবে নজরদারিতে ছিল না। এতে পুরোপুরি ওভারফ্লাইং ফি আদায় করা যেত না। ওই প্রতিবেদনে প্রতি ফ্লাইটে আকাশসীমা ব্যবহারের চার্জ প্রায় ৫০০ ডলার বলে উল্লেখ করা হয়।

ডেইলি মেসেঞ্জারের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নতুন রাডারের কারণে বেবিচকের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। আগে সংস্থাটির রাজস্ব ছিল প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার মধ্যে; নতুন রাডার ব্যবস্থার পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগলে তা প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে এই আয় বৃদ্ধির বিষয়টি সম্ভাবনাভিত্তিক; বাস্তব আয় নির্ভর করবে আকাশসীমায় ফ্লাইটের সংখ্যা, আন্তর্জাতিক রুট, চার্জ আদায়ের সক্ষমতা এবং পূর্ণ অটোমেশন কার্যকর হওয়ার ওপর।

 

‘ভারত-মিয়ানমার টাকা নিচ্ছিল’ দাবি কতটা যাচাইযোগ্য?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অনেক পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী ফ্লাইটের নেভিগেশন চার্জ ভারত ও মিয়ানমার নিয়ে যেত। তবে পাওয়া নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্রগুলোতে এই দাবিটি সরাসরি এমন ভাষায় নিশ্চিত করা হয়নি। যাচাইযোগ্য তথ্য হলো-পুরনো রাডারের সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের পুরো আকাশসীমা, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের ওপরের অংশ, কার্যকরভাবে নজরদারিতে ছিল না এবং এতে ওভারফ্লাইং চার্জ আদায়ে সীমাবদ্ধতা ছিল। বাংলাদেশ মনিটরও ২০২১ সালে লিখেছিল, পুরো এলাকা কাভার না হওয়ায় বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী ফ্লাইট থেকে চার্জ আদায়ে সমস্যা ছিল।

 

তাই সংবাদে “লুটপাট” ধরনের শব্দ ব্যবহার না করে বলা বেশি নিরাপদ-দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ আকাশসীমা ব্যবহারের সম্ভাব্য রাজস্ব পুরোপুরি আদায় করতে পারেনি। নতুন রাডার সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নিজস্ব নজরদারি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করবে।

 

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব

বেবিচক কর্মকর্তারা মনে করছেন, নতুন এটিএমসি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিডিনিউজের প্রতিবেদনে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে অত্যাধুনিক এটিএম-সিএনএস ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে নিরাপত্তা, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ মনিটরের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বেবিচক চেয়ারম্যান জানিয়েছিলেন, নতুন সিএনএস-এটিএম রাডার সিস্টেম কার্যকর হলে দেশের পুরো আকাশসীমা নজরদারির আওতায় আসবে এবং বাংলাদেশ আরও বেশি এয়ার ট্রাফিক সামলাতে পারবে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রাউন্ড-বেইজড রাডারগুলো থ্যালেস সিস্টেমের সঙ্গে ইন্টিগ্রেট করা হয়েছে এবং এয়ার নেভিগেশন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে পূর্ণ অটোমেশনে যাচ্ছে।


সম্পর্কিত নিউজ