{{ news.section.title }}
ফুয়েল লোডিং কী ? এবং এর ভূমিকা কী পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে?
বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরুর মাধ্যমে প্রকল্পটি নির্মাণপর্ব পেরিয়ে উৎপাদনের দিকে আরও এক ধাপ এগোচ্ছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ১৭ এপ্রিল ফুয়েল লোডিংয়ের কমিশনিং লাইসেন্স দিয়েছে, আর সরকারি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী এটি দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে “ফুয়েল” বলতে মূলত স্বল্পমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামভিত্তিক পারমাণবিক জ্বালানিকে বোঝানো হয়। এই জ্বালানি বিশেষভাবে প্রস্তুত ফুয়েল অ্যাসেম্বলির আকারে রিঅ্যাক্টরের কোরে স্থাপন করা হয়। রূপপুরে ব্যবহৃত রিঅ্যাক্টর হচ্ছে রাশিয়ার ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তিভিত্তিক ইউনিট, যা প্রেসারাইজড ওয়াটার রিঅ্যাক্টর শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার নথিতেও রূপপুর প্রকল্পকে ভিভিইআর-১২০০ভিত্তিক দুই ইউনিটের বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বালানি লোডিং মানে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু নয়। এটি আসলে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ধাপে ধাপে সম্পন্ন হওয়া একটি কারিগরি প্রক্রিয়ার সূচনা। প্রথমে রিঅ্যাক্টর কোরে জ্বালানি অ্যাসেম্বলি বসানো হয়, এরপর শুরু হয় নানা ধরনের পরীক্ষা, যাচাই ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ। এই ধাপ পার হওয়ার পর রিঅ্যাক্টরে প্রথম নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন অর্জনের দিকে যাওয়া হয়, যাকে পারমাণবিক পরিভাষায় “ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি” বলা হয়।
রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং ও সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা ধাপে ধাপে শেষ করে পরীক্ষামূলক পরিচালনায় যেতে প্রায় ১০ মাস সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগেই জানিয়েছিল। বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক একাধিক পারমাণবিক প্রকল্পের মতো এখানেও জ্বালানি লোডিংয়ের পরপরই রিঅ্যাক্টরকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো হয় না; বরং খুব নিম্ন শক্তিস্তর থেকে ধীরে ধীরে সক্ষমতা বাড়ানো হয় এবং প্রতিটি ধাপে সিস্টেম, সুরক্ষা ব্যবস্থা ও অপারেশনাল প্যারামিটার পর্যবেক্ষণ করা হয়।
আরো পড়ুন : রূপপুরে আজ জ্বালানি লোডিং শুরু, পরমাণু বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশ
রিঅ্যাক্টর কীভাবে বিদ্যুৎ তৈরি করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভেতরে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে বিপুল তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। সেই তাপে পানি বাষ্পে পরিণত হয়, আর উচ্চচাপের বাষ্প টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। অর্থাৎ, এখানে মূল শক্তির উৎস হলো নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার ফিশন। প্রচলিত তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে যেমন কয়লা, গ্যাস বা তেল পোড়ানো হয়, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে তার বদলে ব্যবহৃত হয় পারমাণবিক জ্বালানি।
রূপপুর প্রকল্পের পথে এর আগেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পেরিয়েছে। ২০২৪ সালে প্রথম ইউনিটে ডামি ফুয়েল লোডিং শুরু হয়েছিল, যা ছিল আসল জ্বালানি প্রবেশের আগে সিস্টেম ও প্রক্রিয়া যাচাইয়ের প্রস্তুতিমূলক ধাপ। ২০২৫ সালে প্রথম ইউনিটে হাইড্রোলিক প্রেসার টেস্টও সফলভাবে সম্পন্ন হয়। এসব ধাপ শেষ হওয়ার পর কমিশনিং লাইসেন্স পাওয়া এবং বাস্তব জ্বালানি লোডিংয়ের পথে যাওয়া প্রকল্পের অগ্রগতির বড় ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারি সূত্রের আগের ভাষ্য অনুযায়ী, জ্বালানি লোডিং শেষে ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের মধ্য দিয়ে ইউনিটটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে শুরু করবে। তবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে হলে নিরাপত্তা, অপারেশনাল স্থিতি এবং পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনার আগে আরও কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে। ফলে জ্বালানি লোডিং যত বড় মাইলফলকই হোক, এটিকে চূড়ান্ত উৎপাদনের শেষ নয়, বরং শেষ দিকের প্রস্তুতির শুরু বলাই বেশি সঠিক।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে রূপপুর প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে মূলত এর দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার কারণে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে নিম্ন-কার্বন বিদ্যুতের উৎস হিসেবে দেখা হয়, কারণ এখানে সরাসরি কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক দহন হয় না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি রূপান্তরের আলোচনায়ও এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর একটি উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রূপপুর চালু হলে দেশের জ্বালানি উৎসে নতুন বৈচিত্র্য যোগ হবে বলেই নীতিনির্ধারকেরা আশা করছেন।
সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়া শুধু একটি কারিগরি পদক্ষেপ নয়; এটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের পূর্বাভাসও। তবে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর, জটিল ও নিরাপত্তানির্ভর হওয়ায় প্রতিটি ধাপ শেষ করে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে এখনও সময় লাগবে।