রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জমি নেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই, ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান আমলে

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জমি নেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই, ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান আমলে
ছবির ক্যাপশান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জমি নেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই

পাবনা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত দেশের প্রথম ও একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকল্পটি অবকাঠামোগত নির্মাণপর্ব থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অপারেশনাল ধাপে প্রবেশ করছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা জানায়, রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়ায় দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরীক্ষামূলক উৎপাদনের পথে এগিয়ে গেল।

তবে আজকের এই মাইলফলকের পেছনে রয়েছে ছয় দশকেরও বেশি সময়ের ইতিহাস। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধারণা স্বাধীন বাংলাদেশের সময়ের নয়। World Nuclear Association-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম বাংলাদেশে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব প্রথম আসে ১৯৬১ সালে। পরে ১৯৬৩ সালে পাবনা জেলার রূপপুর এলাকাকে প্রকল্পস্থল হিসেবে নির্বাচন করা হয় এবং সেখানে জমি অধিগ্রহণ করা হয়

 

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা, আইএইএ-এর বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রোফাইলেও বলা হয়েছে, ১৯৬৩ সালে রূপপুর সাইট নির্বাচন করা হয় এবং প্রকল্পের জন্য ২৯২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। সে সময় প্রকল্প এলাকায় আবাসিক কোয়ার্টার, সাইট অফিসসহ কিছু প্রাথমিক অবকাঠামোও গড়ে তোলা হয়েছিল।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, রূপপুরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ১০৫ দশমিক ৩০ হেক্টর এবং আবাসিক কলোনির জন্য ১২ দশমিক ১৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কথাও সেখানে উল্লেখ আছে।

 

স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান আমলে প্রকল্পটি একাধিকবার পরিকল্পনায় এলেও বাস্তবায়ন হয়নি। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৩ সালে ৭০ মেগাওয়াট, ১৯৬৬ সালে ১৪০ মেগাওয়াট এবং ১৯৬৯ সালে ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সুইডেন, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বেলজিয়ামের সরবরাহকারীরা বিভিন্ন ধরনের রিঅ্যাক্টর সরবরাহের প্রস্তাবও দিয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তের জটিলতায় প্রকল্পটি তখন আর বাস্তব রূপ পায়নি।

 

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার আবারও রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। কয়েক দফা সমীক্ষা, পরিকল্পনা ও চুক্তির পর প্রকল্পটি নতুন গতি পায় রাশিয়ার সহযোগিতায়। বর্তমানে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের সহায়তায় রূপপুরে দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে, প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে কেন্দ্রটির মোট পরিকল্পিত ক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। রয়টার্স জানিয়েছে, রূপপুর প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার এবং এর ৯০ শতাংশ রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হচ্ছে।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপডেট হলো, প্রথম ইউনিটে ফুয়েল লোডিং শুরুর মাধ্যমে রূপপুর এখন সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক ধাপে প্রবেশ করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোসাটম মঙ্গলবার রূপপুরের প্রথম রিঅ্যাক্টরে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরু করেছে। এই ধাপের পর রিঅ্যাক্টরকে ধীরে ধীরে ন্যূনতম নিয়ন্ত্রিত শক্তিস্তরে নেওয়া হবে এবং পরে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে।

 

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের বরাতে গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ফুয়েল লোডিং ও নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষে আগামী আগস্টে প্রথম ধাপে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার আশা করা হচ্ছে। এরপর ২০২৭ সালের জানুয়ারির দিকে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় দ্বিতীয় ইউনিটও গুরুত্বপূর্ণ। বনিকা বার্তা ও ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে মন্ত্রীর বক্তব্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে ফুয়েল লোডিং শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ দুই ইউনিট মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে

 

রূপপুরের প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে বিক্রিয়ার জন্য ১৬৩টি ইউরেনিয়াম ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করা হবে। ইউরেনিয়াম ফুয়েল অ্যাসেম্বলি চুল্লিতে বসানোর পর নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন হবে। সেই তাপে পানি বাষ্পে রূপান্তরিত হয়ে টারবাইন ঘুরাবে এবং সেখান থেকেই উৎপন্ন হবে বিদ্যুৎ।


প্রকল্পটিতে ব্যবহৃত ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তিকে তৃতীয় প্রজন্মের উন্নত পারমাণবিক প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এতে কোর ক্যাচারসহ একাধিক সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, ব্যবস্থাপনা, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য, দক্ষ জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণ-সবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে থাকবে।

 

সব মিলিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ ছয় দশকের পারমাণবিক স্বপ্নের বাস্তবায়ন। ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান আমলে যে জমি নেওয়ার মাধ্যমে রূপপুরের গল্প শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে সেই প্রকল্প এখন বাস্তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দোরগোড়ায়। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ পরিকল্পনায় রূপপুর তাই একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবেই বিবেচিত হবে।


সম্পর্কিত নিউজ