{{ news.section.title }}
কতটুকু সম্পদ থাকলে কোরবানি ওয়াজিব হবে?
ত্যাগ, আনুগত্য ও তাকওয়ার মহিমান্বিত বার্তা নিয়ে মুসলিম উম্মাহর জীবনে আসে পবিত্র ঈদুল আজহা। এই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কোরবানি-যা কেবল পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিসও ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকার এক বাস্তব শিক্ষা। কোরবানির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর অতুলনীয় আনুগত্য, ধৈর্য এবং আল্লাহর হুকুমের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের ঘটনা।
কোরআনের নির্দেশনায় কোরবানির গুরুত্ব
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, অতএব তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করো এবং কোরবানি করো।
(সুরা কাওসার, আয়াত : ২)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, কোরবানি কেবল সামাজিক রীতি নয়; এটি আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এখানে ইখলাস, আল্লাহভীতি এবং বান্দার আনুগত্য-এই তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। অর্থাৎ, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য গোশত সংগ্রহ নয়; বরং আল্লাহর হুকুম পালনের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জন করা।
হাদিসে কোরবানির মর্যাদা
হাদিস শরীফেও কোরবানির গুরুত্ব অত্যন্ত জোর দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে।
সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সে কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২১২৩)
অন্য হাদিসে এসেছে ,
আদম সন্তানের জন্য কোরবানির দিনের আমলসমূহের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো কোরবানি করা।
(তিরমিজি)
এই বাণীগুলো থেকে বোঝা যায়, কোরবানি সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য খুবই গুরুত্ববহ একটি ইবাদত, যা অবহেলা করার বিষয় নয়।
কার ওপর কোরবানি ওয়াজিব
ইসলামের দৃষ্টিতে কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত, যা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সামর্থ্যবান মুসলিম নর-নারীর ওপর ওয়াজিব।
১০ জিলহজ সুবহে সাদিক থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত যেই প্রাপ্তবয়ষ্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক, মুকিম মুসলিম নারী ও পুরুষের কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।
এখানে “সামর্থ্যবান” বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। তবে যাকাতের মতো এখানে এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়। কোরবানির দিনগুলোতে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই কোরবানি ওয়াজিব হয়ে যায়।
কোরবানির জন্য নিসাব পরিমাণ সম্পদ কত
নেসাব হল-
- স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি।
- রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি।
- অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার সমমূল্যের সম্পদ।
স্বর্ণ বা রুপার কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না হয়, তবে স্বর্ণ-রুপা উভয়টি মিলে কিংবা এর সঙ্গে প্রয়োজন-অতিরিক্ত অন্য বস্তুর মূল্য মিলে যদি সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার সমমূল্যের হয়ে যায়, তাহলে কোরবানি ওয়াজিব হবে। স্বর্ণ-রুপার অলঙ্কার, নগদ অর্থ, বাৎসরিক খোরাকীর জন্য প্রয়োজন হয় না এমন জমি এবং প্রয়োজন অতিরিক্ত আসবাবপত্র-সবই কোরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। নির্ভরযোগ্য ফিকহি কিতাবসমূহেও এই মাসআলা বর্ণিত হয়েছে।
কোরবানি শুধু রক্ত ঝরানো নয়
কোরবানির গভীরে আছে আত্মশুদ্ধির শিক্ষা। এই ইবাদতের মাধ্যমে মুসলমান শেখে-আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ভালোবাসা, লোভ, অহংকার এবং দুনিয়াবি আসক্তিকেও ত্যাগ করতে হয়। তাই কোরবানির আসল শিক্ষা হলো তাকওয়া অর্জন। বাহ্যিকভাবে পশু কোরবানি করা হলেও প্রকৃত কোরবানি তখনই হয়, যখন বান্দা নিজের অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেয়।
সমাজে কোরবানির প্রভাব
কোরবানি একটি সামাজিক ইবাদতও বটে। এর মাধ্যমে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে গোশত বণ্টনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে সমাজে সহমর্মিতা, সাম্যবোধ ও ভ্রাতৃত্বের চেতনা জাগ্রত হয়। একজন মুসলমানের ঘরে ঈদের আনন্দ যেমন আসে, তেমনি কোরবানির গোশতের মাধ্যমে অনেক অভাবী মানুষের ঘরেও আনন্দ পৌঁছে যায়। এ কারণেই কোরবানি ব্যক্তি ইবাদতের পাশাপাশি উম্মাহভিত্তিক সৌহার্দ্যেরও প্রতীক।
কোরবানির সময় মুসলমানের করণীয়
কোরবানির দিনগুলোতে শুধু পশু জবাই করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নিয়ত বিশুদ্ধ রাখা, শরিয়তসম্মত পশু নির্বাচন, সঠিক নিয়মে জবাই করা, গোশত সঠিকভাবে বণ্টন করা এবং অপচয় এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ। কোরবানি এমনভাবে আদায় করা উচিত, যাতে এতে ইবাদতের সৌন্দর্যও থাকে, শুদ্ধতাও থাকে, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যও অক্ষুণ্ণ থাকে।