{{ news.section.title }}
উরুগুয়েকে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপে চমক দেখাল কেপ ভার্দে
বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি আসরেই এমন কিছু গল্প জন্ম নেয়, যা পরিসংখ্যান, র্যাঙ্কিং কিংবা ফুটবল ঐতিহ্যের সীমারেখা ভেঙে দেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপেও তেমনই এক অবিশ্বাস্য গল্পের নাম এখন কেপ ভার্দে।
মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে এসেই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত দলে পরিণত হয়েছে। অভিষেক ম্যাচে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দেওয়ার পর অনেকেই সেটিকে ভাগ্য কিংবা এক দিনের চমক বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচে দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ গোলের নাটকীয় ড্রয়ের পর আর সেই ব্যাখ্যা দাঁড় করানো কঠিন।
মায়ামির গরম সন্ধ্যায় মাঠে নামার আগে ফিফা র্যাঙ্কিং, অভিজ্ঞতা, খেলোয়াড়দের মান কিংবা আন্তর্জাতিক সাফল্যের বিচারে দুই দলের মধ্যে পার্থক্য ছিল বিশাল। একদিকে দক্ষিণ আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী শক্তিধর উরুগুয়ে, অন্যদিকে বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নেওয়া কেপ ভার্দে। কিন্তু মাঠের ফুটবল বারবার প্রমাণ করে দিয়েছে, বিশ্বকাপ এমন এক মঞ্চ যেখানে অতীতের সাফল্য নয়, ৯০ মিনিটের পারফরম্যান্সই শেষ কথা বলে।
শুরুতেই ইতিহাস লিখলেন কেভিন পিনা
ম্যাচের ২১ মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত, যা কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসে বহুদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রায় ৩২ মিটার দূর থেকে পাওয়া একটি ফ্রি-কিক থেকে দুর্দান্ত শটে বল জালে পাঠান কেভিন পিনা। উরুগুয়ের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ফার্নান্দো মুসলেরা বলের গতি ও দিক বুঝে ওঠার আগেই বল জড়িয়ে যায় জালে।
এটি ছিল বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের ইতিহাসের প্রথম গোল।
শুধু প্রথম গোলই নয়, ম্যাচের সবচেয়ে বড় চমকও ছিল সেটি। কারণ বিশ্বকাপে উরুগুয়ে এর আগে কখনও সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে গোল হজম করেনি। ফলে এক গোলেই দুটি ইতিহাস লিখে ফেলে কেপ ভার্দে। পরিসংখ্যানবিদদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম গোল সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে করা দেশের তালিকাও অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। ১৯৩০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার লুইস মন্টির পর কেপ ভার্দে এই বিরল কীর্তি গড়া অন্যতম দল।
উরুগুয়ের প্রত্যাবর্তন
গোল হজমের পর স্বাভাবিকভাবেই আক্রমণের গতি বাড়িয়ে দেয় মার্সেলো বিয়েলসার দল। ফেদেরিকো ভালভের্দে, রদ্রিগো বেনতাঙ্কুর, মাক্সিমিলিয়ানো আরাউহোদের নেতৃত্বে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে উরুগুয়ে। কেপ ভার্দের রক্ষণভাগকে দীর্ঘ সময় চাপে রাখার পর ৪৪ মিনিটে সমতা ফেরে। পোস্টে লেগে ফিরে আসা বলে হেড করে গোল করেন মাক্সিমিলিয়ানো আরাউহো।
এই গোলের পর গ্যালারিতে থাকা উরুগুয়ে সমর্থকদের স্বস্তি ফিরে আসে। আর প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে আগুস্তিন কানোবিওর গোলে ম্যাচে প্রথমবারের মতো এগিয়েও যায় দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার সময় স্কোরলাইন বলছিল, ম্যাচটি হয়তো এখন উরুগুয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
হার না মানা কেপ ভার্দে
কিন্তু এখানেই শুরু হয় কেপ ভার্দের আসল গল্প। বিরতির পর মাঠে নেমে তারা বুঝিয়ে দেয়, স্পেনের বিপক্ষে পয়েন্ট নেওয়া কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা পুরো মাঠজুড়ে দারুণ শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলতে থাকে। বল দখলে পিছিয়ে থাকলেও আক্রমণে যাওয়ার সাহস হারায়নি তারা। ৬১ মিনিটে উরুগুয়ের রক্ষণভাগের ভুল কাজে লাগিয়ে সমতা ফেরান বদলি নামা হেলিও ভারেলা।
মাতিয়াস ওলিভিয়েরা বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ভুল করেন। গোলরক্ষক মুসলেরাও তখন নিজের অবস্থান থেকে কিছুটা এগিয়ে ছিলেন। সুযোগ বুঝে বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঠান্ডা মাথায় জালে পাঠিয়ে দেন ভারেলা। ম্যাচ আবার সমতায় ফিরে আসে।
সংখ্যার হিসাবেও বিস্ময়
স্কোরলাইন ২-২ হলেও ম্যাচের পরিসংখ্যান কেপ ভার্দের লড়াইয়ের গভীরতা আরও ভালোভাবে তুলে ধরে। উরুগুয়ে পুরো ম্যাচে ১৭টি শট নেয়। কিন্তু লক্ষ্যভেদ করতে পারে মাত্র ২টি। অন্যদিকে কেপ ভার্দে ১২টি শট নেয় এবং তার মধ্যে ৪টি ছিল লক্ষ্যে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলেও কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়াকে খুব বেশি কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়নি। অন্যদিকে মুসলেরাকে অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করতে হয়েছে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখতে।
উরুগুয়ের সামনে কঠিন সমীকরণ
এই ড্রয়ের ফলে গ্রুপ ‘এইচ’-এর হিসাবও জটিল হয়ে উঠেছে। দুই ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে স্পেন। উরুগুয়ে ও কেপ ভার্দে উভয়ের সংগ্রহ ২ পয়েন্ট হলেও গোল ব্যবধানে এগিয়ে দ্বিতীয় স্থানে উরুগুয়ে। সৌদি আরব রয়েছে এক পয়েন্ট নিয়ে। এখন কেপ ভার্দের সামনে ইতিহাস গড়ার সুবর্ণ সুযোগ। শেষ ম্যাচে সৌদি আরবকে হারাতে পারলে নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
অন্যদিকে উরুগুয়ের সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন পরীক্ষা। শেষ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ স্পেন। নকআউটে উঠতে হলে সেই ম্যাচে জয় পাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
বিশ্বকাপের নতুন বিস্ময়
বিশ্বকাপের ইতিহাসে মাঝে মাঝেই ছোট দলগুলো বড় মঞ্চে নিজেদের পরিচয় বদলে দেয়। ১৯৯০ সালে ক্যামেরুন, ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া, ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়া কিংবা ২০২২ সালে মরক্কোর মতো দলগুলো সেই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই তালিকায় নতুন নাম হয়ে উঠছে কেপ ভার্দে।
স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র, এরপর উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ ড্র-এই দুই ফলাফল প্রমাণ করে দিয়েছে, কেপ ভার্দে কেবল অংশ নিতে আসেনি। তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এসেছে। আর ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে সেটাই সবচেয়ে বড় বার্তা।
জনসংখ্যা, অর্থনীতি কিংবা ফুটবল ঐতিহ্য নয়-বিশ্বকাপে সাহস, সংগঠন, শৃঙ্খলা ও বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় শক্তি। কেপ ভার্দে এখন সেই বিশ্বাসেরই নতুন প্রতীক।