{{ news.section.title }}
ইতিহাস গড়ল মিসর, বিশ্বকাপে এলো প্রথম জয়
অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো অবশেষে। প্রায় এক শতাব্দীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের প্রথম জয়ের স্বাদ পেল মিশর। ভ্যাঙ্কুভারের বিসি প্লেস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত রোমাঞ্চকর এক ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে আফ্রিকার দেশটি।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি শুধু একটি জয় নয়, বরং মিশরীয় ফুটবলের জন্য এক আবেগঘন অধ্যায়ের সূচনা। ১৯৩৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার পর ১৯৯০, ২০১৮ এবং বর্তমান আসর মিলিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে জয়হীন ছিল দলটি। অবশেষে নবম বিশ্বকাপ ম্যাচে এসে সেই আক্ষেপ ঘুচল।
ম্যাচ শেষে মিশরের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং সমর্থকদের উচ্ছ্বাস দেখে সহজেই বোঝা যাচ্ছিল, এই জয় তাদের কাছে কতটা মূল্যবান।
শুরুতেই ধাক্কা খায় মিশর
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা করে। তবে প্রথম বড় আঘাতটা আসে মিসরের ওপর। ১৫ মিনিটে কর্নার থেকে আসা বলে দুর্দান্ত হেডে গোল করেন নিউজিল্যান্ডের ডিফেন্ডার ফিন সারম্যান। মিসরের রক্ষণভাগকে হতবাক করে দিয়ে দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি।
গোলের পর আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে নিউজিল্যান্ড। প্রথমার্ধে কয়েকবার দ্রুত পাল্টা আক্রমণও চালায় তারা। অন্যদিকে বলের নিয়ন্ত্রণ বেশি সময় নিজেদের কাছে রাখলেও কাঙ্ক্ষিত সুযোগ তৈরি করতে হিমশিম খেতে থাকে মিসর। বিশেষ করে সালাহকে ঘিরে রাখা নিউজিল্যান্ডের ডিফেন্ডারদের কৌশল প্রথমার্ধে বেশ কার্যকর ছিল।
বিরতিতে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে মাঠ ছাড়ে মিশর।
দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র
প্রথমার্ধের হতাশা ঝেড়ে দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে মাঠে নামে মিশর।
কোচের নির্দেশনায় তারা আরও দ্রুতগতির আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে। এর ফলও আসে দ্রুত। ৫৮ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে মোহাম্মদ হানির নিখুঁত ক্রসে বক্সের ভেতর উঠে আসেন মোস্তাফা জিকো। শক্তিশালী হেডে বল জালে পাঠিয়ে ম্যাচে সমতা ফেরান তিনি। এই গোলের পর ম্যাচের গতি পুরোপুরি বদলে যায়।
নিউজিল্যান্ড রক্ষণাত্মক হয়ে পড়লে মিসর আরও বেশি আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাঝমাঠে তাদের দখল বাড়তে থাকে এবং সালাহ ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন।
ইতিহাসের মুহূর্তে সালাহ
ম্যাচের ৬৭ মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত, যার অপেক্ষায় ছিলেন মিশরের কোটি সমর্থক। মোস্তাফা জিকোর চমৎকার পাস ধরে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের দারুণ বাঁকানো শটে গোল করেন মোহাম্মদ সালাহ।
নিউজিল্যান্ড গোলরক্ষক ঝাঁপিয়েও বলের নাগাল পাননি। গোলের পর সালাহর উদযাপন ছিল আবেগে ভরা। সতীর্থরা তাকে ঘিরে ধরেন, আর গ্যালারিতে থাকা মিশরীয় সমর্থকদের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। এই গোল শুধু ম্যাচে মিসরকে এগিয়ে দেয়নি, বরং বিশ্বকাপে দলটির প্রথম জয়ের ভিত্তিও তৈরি করে দেয়।
ত্রেজেগের সিলমোহর
নিউজিল্যান্ড যখন সমতায় ফেরার মরিয়া চেষ্টা করছে, তখনই শেষ আঘাতটি হানে মিশর। ৮২ মিনিটে সালাহর নেওয়া কর্নার থেকে বল পেয়ে সহজ হেডে গোল করেন বদলি নামা ত্রেজেগে। গোলরক্ষকের সামনে প্রায় অরক্ষিত অবস্থায় থাকা এই ফরোয়ার্ড কোনো ভুল করেননি।
স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৩-১।
শেষ কয়েক মিনিটে নিউজিল্যান্ড চেষ্টা করলেও আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি।
সালাহর নেতৃত্বে নতুন আত্মবিশ্বাস
ম্যাচজুড়ে সালাহ শুধু গোলই করেননি, পুরো আক্রমণভাগ পরিচালনাও করেছেন। প্রথমার্ধে নিউজিল্যান্ডের ডিফেন্ডাররা তাকে আটকে রাখতে সক্ষম হলেও দ্বিতীয়ার্ধে তার গতিশীলতা, পাসিং এবং নেতৃত্ব মিসরের খেলার ধরনই বদলে দেয়।
বিশ্ব ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকার অন্যতম বড় তারকা হিসেবে পরিচিত সালাহ এবার জাতীয় দলের হয়েও বড় মঞ্চে নিজের প্রভাব দেখালেন। বিশ্লেষকদের মতে, মিশরের এই জয় শুধু তিন পয়েন্টের নয়, এটি পুরো দলের আত্মবিশ্বাস কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মিশরের জয়
মিসর আফ্রিকার অন্যতম সফল জাতীয় দল হলেও বিশ্বকাপে তাদের ইতিহাস কখনোই খুব সমৃদ্ধ ছিল না। ১৯৩৪ সালে প্রথমবার অংশগ্রহণের পর দীর্ঘ ৫৬ বছর বিশ্বকাপের বাইরে ছিল দলটি। এরপর ১৯৯০ সালে ফিরে এলেও জয় পায়নি। ২০১৮ বিশ্বকাপে সালাহকে ঘিরে বড় প্রত্যাশা তৈরি হলেও সেবারও জয়হীনভাবে বিদায় নিতে হয়েছিল।
তাই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয় শুধু বর্তমান দলের নয়, বরং কয়েক প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমী মিসরীয় সমর্থকদের স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত।
গ্রুপ ‘জি’-তে নতুন সমীকরণ
ম্যাচের আগে পরিস্থিতি ছিল বেশ জমজমাট। প্রথম ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করেছিল মিশর। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে ২-২ ড্র করেছিল নিউজিল্যান্ড। এদিকে দিনের অন্য ম্যাচে বেলজিয়াম ও ইরান ড্র করায় মিশর-নিউজিল্যান্ড ম্যাচের বিজয়ী দল গ্রুপের শীর্ষে ওঠার সুযোগ পায়।
সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে মিশর।
দুই ম্যাচে চার পয়েন্ট নিয়ে এখন তারা গ্রুপ ‘জি’-এর শীর্ষে অবস্থান করছে। ফলে নকআউট পর্বে ওঠার লড়াইয়ে বড় সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেছে সালাহর দল। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের সামনে এখন কঠিন সমীকরণ অপেক্ষা করছে।
নতুন স্বপ্ন দেখছে মিশর
বিশ্বকাপে প্রথম জয় পাওয়ার পর এখন মিসরের লক্ষ্য আরও বড়। এই জয়ের মাধ্যমে শুধু ইতিহাস লেখা হয়নি, বরং নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্নও বাস্তব রূপ পেতে শুরু করেছে।
বিশ্বকাপের আগে অনেকেই মিসরকে গ্রুপ পর্ব পেরোনোর সম্ভাব্য দল হিসেবে বিবেচনা করেননি। কিন্তু বেলজিয়ামের সঙ্গে ড্র এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয় প্রমাণ করেছে, তারা এবার শুধু অংশ নিতে আসেনি।
সালাহর নেতৃত্বে ‘ফারাওরা’ এখন নতুন ইতিহাস গড়ার মিশনে নেমেছে। আর ভ্যাঙ্কুভারের এই রাতটি মিসরের ফুটবল ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।