বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ড হারিয়ে ক্লোসা বললেন, ‘মেসিই সর্বকালের সেরা’

বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ড হারিয়ে ক্লোসা বললেন, ‘মেসিই সর্বকালের সেরা’
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু রেকর্ড আছে, যেগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়-একটি যুগের প্রতীক। সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড তেমনই একটি অর্জন। বহু বছর ধরে এই সম্মানের মুকুট ছিল জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার মাথায়। কিন্তু ডালাসে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে সেই ইতিহাস নতুন করে লিখেছেন লিওনেল মেসি।

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দুই গোল করে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৮-তে উন্নীত করেছেন মেসি। এর মধ্য দিয়ে তিনি পেছনে ফেলেছেন জার্মানির সাবেক স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসাকে, যিনি চারটি বিশ্বকাপে ২৪ ম্যাচে ১৬ গোল করে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে রেকর্ডটির একক মালিক ছিলেন।

 

ম্যাচের আগে দুজনই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় যৌথভাবে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মেসির জোড়া গোল তাকে এককভাবে শীর্ষে নিয়ে গেছে। আর সেই মুহূর্তটি ফুটবল বিশ্বের জন্য হয়ে উঠেছে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়।

 

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যাঁর রেকর্ড ভাঙা হয়েছে, সেই মিরোস্লাভ ক্লোসাই সবার আগে মেসিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বর্তমানে জার্মানির দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব নুরেমবার্গের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ৪৮ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি জার্মান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমার কাছে লিওনেল মেসিই সর্বকালের সেরা। অভিনন্দন চ্যাম্পিয়ন!”

 

How Miroslav Klose became a German treasure

 

ফুটবল ইতিহাসে রেকর্ড ভাঙার ঘটনা নতুন নয়। ২০০৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও জার্মানির আরেক কিংবদন্তি গার্ড মুলারের ১৪ গোলের রেকর্ড ভেঙেছিলেন। এরপর ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষেই রোনালদোর ১৫ গোলের রেকর্ড অতিক্রম করেন মিরোস্লাভ ক্লোসা।

 

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই রেকর্ড অক্ষত ছিল। অবশেষে বিশ্ব ফুটবলের আরেক মহাতারকা লিওনেল মেসি নতুন ইতিহাস গড়লেন।

 

বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ গোল করেছেন মাত্র ১৬ জন ফুটবলার। এই তালিকায় সক্রিয় খেলোয়াড় হিসেবে রয়েছেন মাত্র তিনজন-আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন।

 

বর্তমানে মেসির গোলসংখ্যা ১৮, এমবাপ্পের ১৫ এবং কেইনের ১০। বয়সের দিক থেকে ২৭ বছর বয়সী এমবাপ্পের সামনে এখনও একাধিক বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে তিনিও এই রেকর্ডের বড় দাবিদার হতে পারেন। তবে পরিসংখ্যানের দিক থেকে মেসি ও ক্লোসার তুলনা করলে কিছু ভিন্ন চিত্রও দেখা যায়।

 

ক্লোসা বিশ্বকাপে মোট ১৭৯৩ মিনিট খেলেছেন এবং ৬৬টি শট থেকে ১৬টি গোল করেছেন। অর্থাৎ তার গোল রূপান্তরের হার ছিল প্রায় ২৪ শতাংশ। প্রতি গোল করতে তার গড়ে সময় লেগেছে ১১২ মিনিট।

 

অন্যদিকে অস্ট্রিয়া ম্যাচ পর্যন্ত মেসি বিশ্বকাপে খেলেছেন ২৪৮৪ মিনিট। তিনি নিয়েছেন ১১৮টি শট এবং করেছেন ১৮ গোল। তার গোল রূপান্তরের হার প্রায় ১৫ শতাংশ এবং প্রতি গোল করতে সময় লেগেছে গড়ে ১৩৮ মিনিট।

 

সংখ্যার হিসেবে ক্লোসা কিছু জায়গায় এগিয়ে থাকলেও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ক্লোসা ছিলেন একজন নিখাদ স্ট্রাইকার, যার মূল কাজই ছিল গোল করা। কিন্তু মেসি পুরো ক্যারিয়ারে খেলেছেন প্লে-মেকার, অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার কিংবা ফলস নাইন হিসেবে।

 

অর্থাৎ তিনি শুধু গোল করেননি, গোলও তৈরি করেছেন। আক্রমণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপে জড়িত থেকেও বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়া তার অর্জনকে আরও অসাধারণ করে তুলেছে।

 

বিশ্বকাপে মেসির যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে জার্মানিতে। সে সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। প্রথম বিশ্বকাপে জন্মদিন উদযাপন করেছিলেন তিনি টুর্নামেন্ট চলাকালেই। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং বর্তমান আসর-মোট ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।

 

২০১৪ সালে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জিতে পূরণ করেন ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। আর এবার তিনি যোগ করলেন আরেকটি অবিশ্বাস্য অর্জন।

 

বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকাও এখন নতুনভাবে সাজানো হয়েছে-

 

১. লিওনেল মেসি – ১৮ গোল
২. মিরোস্লাভ ক্লোসা – ১৬ গোল
৩. রোনালদো নাজারিও – ১৫ গোল
৪. গার্ড মুলার – ১৪ গোল
৫. জুস্ট ফন্টেইন – ১৩ গোল
৬. পেলে – ১২ গোল
৭. সান্দর কশিস – ১১ গোল
৮. ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমান – ১১ গোল
৯. গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা – ১০ গোল
১০. গ্যারি লিনেকার – ১০ গোল
১১. থমাস মুলার – ১০ গোল
১২. হ্যারি কেইন – ১০ গোল

 

বিশ্বকাপে গোলের পাশাপাশি মেসির আরও কয়েকটি রেকর্ড ইতোমধ্যেই ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। তিনি সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলারদের একজন। সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপে অ্যাসিস্ট করা খেলোয়াড়দের তালিকাতেও শীর্ষে আছেন। নকআউট পর্বে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়েও তিনি অন্যতম সেরা।

 

ফিফার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যান অব দ্য ম্যাচ পুরস্কারও জিতেছেন মেসি। এছাড়া তিনি একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল কিংবা অ্যাসিস্টে অবদান রাখার কীর্তি গড়েছেন। ডালাসের ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উল্লাস ছিল দেখার মতো। স্টেডিয়ামে ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি ওঠে বারবার। সতীর্থরাও তাকে ঘিরে উদযাপন করেন ঐতিহাসিক এই মুহূর্ত।

 

কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেন, “আমরা এমন একজন ফুটবলারের সঙ্গে কাজ করছি, যিনি প্রতিদিন নতুন ইতিহাস লিখছেন। তার অর্জন শুধু আর্জেন্টিনার নয়, পুরো ফুটবল বিশ্বের।”

 

অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মেসির প্রশংসায় ভাসছেন সাবেক ও বর্তমান ফুটবলাররা। অনেকেই তাকে ‘বিশ্বকাপের রাজা’ বলেও অভিহিত করেছেন।

 

মিরোস্লাভ ক্লোসার মতো একজন কিংবদন্তির কাছ থেকে ‘সর্বকালের সেরা’ স্বীকৃতি পাওয়া মেসির এই অর্জনকে আরও বিশেষ করে তুলেছে। সংখ্যার বিচারে তিনি এখন বিশ্বকাপের নতুন গোলসম্রাট, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের কাছে হয়তো তার সবচেয়ে বড় পরিচয়-তিনি এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি গোল করার পাশাপাশি পুরো খেলাটিকেই শিল্পে পরিণত করেছেন।

 

বিশ্বকাপের মঞ্চে তার এই নতুন রেকর্ড ভবিষ্যতে ভাঙা সম্ভব কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত ইতিহাসের সর্বোচ্চ চূড়ায় একাই দাঁড়িয়ে আছেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।


সম্পর্কিত নিউজ