{{ news.section.title }}
হলান্ডের জোড়া গোলে ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান, নকআউটে নরওয়ে
নরওয়ে ৩–২ সেনেগাল নিউ জার্সির স্টেডিয়ামে তখন ম্যাচের ৮৯ মিনিট। বাঁ প্রান্তে বল পেয়ে নিজের অর্ধ থেকে দৌড় শুরু করেন আর্লিং হলান্ড। একে একে কাটিয়ে যান তিনজন সেনেগালি ডিফেন্ডারকে। একজন ডিফেন্ডার তাকে থামাতে পেছন থেকে জার্সিও টেনে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতেও থামেননি নরওয়ের তারকা স্ট্রাইকার। শেষ পর্যন্ত অস্কার ববের শট পোস্টে লেগে ফিরে না এলে হয়তো ম্যাচের সেরা গোলগুলোর একটি দেখা যেত।
যদিও ওই আক্রমণ থেকে গোল হয়নি, তবে পুরো ম্যাচের চিত্র যেন ওই একটি মুহূর্তেই ধরা পড়ে। সেনেগাল দুই গোল করলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল নরওয়ের হাতেই। আক্রমণ, গতি, সুযোগ তৈরি এবং ফিনিশিং-সব মিলিয়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দলটি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে।
অবশেষে সেনেগালকে ৩–২ গোলে হারিয়ে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব নিশ্চিত করল নরওয়ে।
১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে এসেছে নরওয়ে। সেই আসরে তারা শেষ ষোলোতে উঠেছিল। এবার নতুন ৪৮ দলের বিশ্বকাপে ফিরে আবারও শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিল স্টালে সলব্যাকেনের দল।
প্রথমার্ধে ম্যাচটি ছিল বেশ লড়াইয়ের। সেনেগাল শুরুতে বলের দখলে এগিয়ে থাকলেও ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় নরওয়ে। মার্টিন ওডেগার্ড ও সান্দের বের্গ মাঝমাঠে দারুণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। ৪৩ মিনিটে আসে ম্যাচের প্রথম গোল। সেনেগালের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার কালিদু কুলিবালির ভুল পাস কেটে নিয়ে বক্সে ঢুকে গোল করেন বদলি ডিফেন্ডার মার্কুস পেদারসেন। গোলটি সেনেগালের রক্ষণভাগের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দেয়।
১–০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় নরওয়ে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নেন আর্লিং হলান্ড। ৪৮ মিনিটে দ্রুত এক পাল্টা আক্রমণ থেকে মার্টিন ওডেগার্ডের নিখুঁত পাস পেয়ে গোল করেন ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর সেনেগাল ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে। ৫৩ মিনিটে সাদিও মানের দারুণ পাস থেকে গোল করেন ইসমাইলা সার। তাতে কিছুটা আশা ফিরে পায় আফ্রিকার প্রতিনিধিরা।
কিন্তু পাঁচ মিনিট পরই আবারও আঘাত হানে নরওয়ে।
সেনেগালের ডিফেন্ডাররা দুইবার চেষ্টা করেও বক্স থেকে বল ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হন। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্যাট্রিক বার্গ বল বাড়ান হলান্ডকে। দুর্দান্ত এক ভলিতে বল জালে জড়িয়ে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন নরওয়ের এই সুপারস্টার। এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসেও জায়গা করে নিয়েছেন হলান্ড। বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ম্যাচেই একাধিক গোল করা মাত্র ষষ্ঠ ফুটবলার এখন তিনি। এখন পর্যন্ত দুই ম্যাচে চার গোল করেছেন হলান্ড। বিশ্বকাপে গোলসংখ্যার তালিকাতেও দ্রুত ওপরে উঠে আসছেন তিনি।
পরিসংখ্যান আরও বিস্ময়কর। নরওয়ের জার্সিতে টানা ১২ ম্যাচে গোল করেছেন হলান্ড। সর্বশেষ ছয় ম্যাচে অন্তত দুটি করে গোল করার কীর্তিও গড়েছেন তিনি। ম্যাচ শেষে নরওয়ের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড বলেন, “হলান্ড শুধু গোল করে না, সে পুরো দলকে আত্মবিশ্বাস দেয়। তার উপস্থিতি আমাদের আরও সাহসী করে তোলে।”
সেনেগাল অবশ্য শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছে। যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে বক্সের ভেতর জটলার মধ্যে থেকে দ্বিতীয় গোল করেন ইসমাইলা সার। ম্যাচে এটিও ছিল তার দ্বিতীয় গোল। রেফারি ৯ মিনিট অতিরিক্ত সময় দেওয়ায় তখন মনে হচ্ছিল সেনেগাল হয়তো নাটকীয়ভাবে ম্যাচে ফিরতে পারে। কিন্তু উল্টো শেষ মুহূর্তে আরও অন্তত দুটি নিশ্চিত সুযোগ নষ্ট করে নরওয়ে। ম্যাচের পরিসংখ্যানও নরওয়ের আধিপত্যের প্রমাণ দেয়।
বলের দখলে দুই দল প্রায় সমান থাকলেও নরওয়ে আক্রমণে ছিল অনেক বেশি কার্যকর। ওডেগার্ড একাই একাধিক সুযোগ তৈরি করেছেন। অস্কার বব, আন্তোনিও নুসা এবং হলান্ডের গতিময় ফুটবল সেনেগালকে বারবার সমস্যায় ফেলেছে। বিশেষ করে ওডেগার্ড ও হলান্ডের বোঝাপড়া ছিল চোখে পড়ার মতো। আর্সেনাল অধিনায়ক ওডেগার্ড ম্যাচে সর্বাধিক কী পাস দেন এবং নরওয়ের তিনটি গোলের মধ্যে দুটি আক্রমণের সূচনা তার পা থেকেই আসে।
অন্যদিকে সেনেগালের হয়ে সাদিও মানে যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। ইসমাইলা সার দুটি গোল করলেও মাঝমাঠে ইদ্রিসা গানা গেই এবং পাপে সার প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারেননি। আফ্রিকার দলটি রক্ষণেও বেশ অগোছালো ছিল। বিশেষ করে কুলিবালির ভুল এবং বক্সের ভেতরে বল ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হওয়াই ম্যাচের বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটিই নরওয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জয়। ১৯৯৮ সালের পর দীর্ঘ ২৮ বছর অপেক্ষার পর তারা আবার নকআউট পর্বে উঠল।
‘আই’ গ্রুপে ইতোমধ্যে ফ্রান্সও নকআউট নিশ্চিত করেছে। ইরাককে হারিয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে দিদিয়ের দেশমের দল। নরওয়েরও সমান ৬ পয়েন্ট হলেও গোল ব্যবধানে তারা দ্বিতীয় স্থানে।
সেনেগাল এখন কঠিন সমীকরণের সামনে। শেষ ম্যাচে জিতলেও অন্য ম্যাচের ফলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে তাদের।
বিশ্বকাপে নরওয়ের প্রত্যাবর্তনের গল্পে সবচেয়ে বড় নাম এখন নিঃসন্দেহে আর্লিং হলান্ড। ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে বহু রেকর্ড গড়ার পর এবার বিশ্বকাপেও নিজের ছাপ রাখতে শুরু করেছেন তিনি। বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে চার গোল করে তিনি ইতোমধ্যেই গোল্ডেন বুটের অন্যতম দাবিদার হয়ে উঠেছেন।
ম্যাচ শেষে হলান্ড বলেন, “বিশ্বকাপে খেলা সব সময়ই আমার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু নরওয়েকে নকআউটে তুলতে পারা আরও বড় অর্জন। আমরা এখানেই থামতে চাই না।”
২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে নকআউট নিশ্চিত করা নরওয়ের জন্য এটি শুধু একটি জয় নয়, বরং নতুন এক ফুটবল যুগের সূচনা। আর সেই নতুন যুগের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখের নাম-আর্লিং হলান্ড।