মদরিচের ২০০তম ম্যাচে জয়ে টিকে রইল ক্রোয়েশিয়া, বিদায় পানামার

মদরিচের ২০০তম ম্যাচে জয়ে টিকে রইল ক্রোয়েশিয়া, বিদায় পানামার
ছবির ক্যাপশান, ছবি: রয়টার্স

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক ম্যাচে শেষ পর্যন্ত জয় পেয়েছে ক্রোয়েশিয়া। তবে জয়টি যতটা সহজ হওয়ার কথা ছিল, মাঠের লড়াই ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। টরন্টো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে মধ্য আমেরিকার দেশ পানামাকে ১-০ গোলে হারিয়েছে ২০১৮ বিশ্বকাপের রানার্সআপরা। ম্যাচের একমাত্র গোলটি করেন অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার আন্তে বুদিমির।

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ক্রোয়েশিয়ার চেয়ে ২৯ ধাপ পিছিয়ে থাকা পানামার বিপক্ষে ম্যাচ শুরুর আগে সহজ জয়ের প্রত্যাশা ছিল লুকা মদরিচদের। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং সাহসী ফুটবলে শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়াকে বেশ চাপে রাখে পানামা।

 

প্রথমার্ধে চমকে দেয় পানামা

ম্যাচের শুরু থেকেই বল দখলে আধিপত্য দেখানোর চেষ্টা করে ক্রোয়েশিয়া। লুকা মদরিচ, মাতেও কোভাচিচ ও মারিও পাশালিচ মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করলেও পানামার রক্ষণভাগ ছিল অত্যন্ত সংগঠিত।

 

প্রথমার্ধে কয়েকটি আক্রমণ তৈরি করলেও পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয় ক্রোয়াটরা। অন্যদিকে পানামা দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক থেকে কয়েকবার ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্সে চাপ সৃষ্টি করে। কয়েকটি আক্রমণে বলকান অঞ্চলের দেশটির বক্সে আতঙ্কও ছড়িয়ে দেয় মধ্য আমেরিকার প্রতিনিধিরা।

 

গোলশূন্য অবস্থায় বিরতিতে যাওয়ার সময় ক্রোয়েশিয়ার খেলোয়াড়দের মুখে কিছুটা হতাশার ছাপ দেখা যায়। কারণ বিশ্বকাপে টিকে থাকতে এই ম্যাচে জয় ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না তাদের সামনে।

 

বিরতির পর বদলেই বদলে যায় ম্যাচ

প্রথমার্ধে আক্রমণে ধার না থাকায় বিরতির পরই কৌশলগত পরিবর্তন আনেন ক্রোয়েশিয়া কোচ জ্লাতকো দালিচ। ডিফেন্ডার ইয়োশকো গাভার্দিওল এবং ফরোয়ার্ড পেতার মুসাকে তুলে মাঠে নামান দুই আক্রমণভাগের খেলোয়াড় আন্তে বুদিমির ও আন্দ্রে ক্রামারিচকে। দালিচের এই সিদ্ধান্তই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

 

দ্বিতীয়ার্ধের ৫৪ মিনিটে ডান দিক থেকে ডিফেন্ডার ইয়োসিপ স্তানিসিচের বাড়ানো বল বক্সের ভেতরে পা ছুঁইয়ে জালে জড়িয়ে দেন বুদিমির। পানামার গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না। গোলের পর ক্রোয়েশিয়ার খেলায় আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। মদরিচরা মাঝমাঠে আরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ম্যাচের গতি নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসেন।

 

হাল ছাড়েনি পানামা

গোল হজম করার পরও ম্যাচ থেকে ছিটকে যায়নি পানামা। বরং তারা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ার্ধে একাধিকবার ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করে তারা। বিশেষ করে ৬২ মিনিটে পরপর দুটি দুর্দান্ত সুযোগ তৈরি করে পানামা। কিন্তু ক্রোয়াট গোলরক্ষক দমিনিক লিভাকোভিচ অসাধারণ দক্ষতায় দুটি শট ঠেকিয়ে দেন। তার সেই সেভগুলোই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

 

পরিসংখ্যানও বলে, ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার তুলনায় পানামা পোস্টে বেশি শট রাখতে সক্ষম হয়েছে। সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার আক্ষেপ নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে তাদের।

 

মদরিচের ২০০তম ম্যাচে স্মরণীয় জয়

এই ম্যাচটি ছিল ক্রোয়েশিয়ার কিংবদন্তি মিডফিল্ডার লুকা মদরিচের জন্য বিশেষ একটি উপলক্ষ। জাতীয় দলের জার্সিতে এটি ছিল তার ২০০তম ম্যাচ। ৪০ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার এখনও দলের মাঝমাঠের প্রাণভোমরা। বয়স বাড়লেও তার পাসিং, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এখনও ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি।

 

ম্যাচের ৮১ মিনিটে তাকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ জ্লাতকো দালিচ। মাঠ ছাড়ার সময় দর্শকরা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাকে সম্মান জানান। ম্যাচ শেষে ক্রোয়েশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে মদরিচকে স্মারক জার্সি উপহার দেওয়া হয়। জাতীয় দলের হয়ে ২০০ ম্যাচ খেলার এই অর্জন ক্রোয়েশিয়ান ফুটবলের ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

 

বুদিমিরের নতুন ইতিহাস

জয়সূচক গোল করা আন্তে বুদিমিরও ম্যাচটিকে স্মরণীয় করে রাখলেন নিজের জন্য। ৩৪ বছর ৩৩৭ দিন বয়সে গোল করে তিনি বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতার রেকর্ড গড়েছেন। এর আগে এই রেকর্ডটি ছিল ইভিকা ওলিচের দখলে। ওসাসুনা ফরোয়ার্ড বুদিমির এখন নতুন ইতিহাসের মালিক।

 

অভিজ্ঞ এই স্ট্রাইকারের গোলই বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার আশা বাঁচিয়ে রাখল। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করে তিনি নিজের প্রয়োজনীয়তাও প্রমাণ করলেন।

 

গ্রুপের সমীকরণ জমে উঠেছে

‘এল’ গ্রুপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে প্রথম জয় পেয়েছে ক্রোয়েশিয়া। প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ৪-২ গোলে হেরেছিল তারা। দুই ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ড ও ঘানা উভয়েরই সংগ্রহ চার পয়েন্ট। গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে শীর্ষে রয়েছে ইংল্যান্ড এবং দ্বিতীয় স্থানে আছে ঘানা।

 

এক জয় ও এক হারে তিন পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ক্রোয়েশিয়া। অন্যদিকে টানা দুই ম্যাচ হেরে কোনো পয়েন্ট ছাড়াই গ্রুপের তলানিতে অবস্থান করছে পানামা। সব দলেরই এখন বাকি রয়েছে একটি করে ম্যাচ। আগামী শনিবার ঘানার বিপক্ষে মাঠে নামবে ক্রোয়েশিয়া। সেই ম্যাচে জয় পেলেই নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত হবে মদরিচদের।

 

সাহসী লড়াই করেও বিদায় পানামার

ফলাফল নিজেদের পক্ষে না এলেও পানামার ফুটবলারদের পারফরম্যান্স প্রশংসা পাওয়ার মতো। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তারা ভয়হীন ফুটবল খেলেছে। ম্যাচের বিভিন্ন সময়ে আক্রমণে উঠে এসেছে, গোলের সুযোগ তৈরি করেছে এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছে। কিন্তু গোল করতে না পারার ব্যর্থতায় বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে মধ্য আমেরিকার দেশটিকে। এ নিয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিশ্চিত হলো পানামার। ২০১৮ বিশ্বকাপেও দ্বিতীয় ম্যাচের পরই তাদের বিদায় নিশ্চিত হয়েছিল।

 

তবে এবারের বিশ্বকাপে তাদের লড়াকু মানসিকতা এবং সংগঠিত ফুটবল ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। অন্যদিকে কষ্টার্জিত এই জয় ক্রোয়েশিয়ার নকআউট স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছে। এখন ঘানার বিপক্ষে শেষ ম্যাচেই নির্ধারিত হবে মদরিচদের বিশ্বকাপ ভাগ্য।


সম্পর্কিত নিউজ