{{ news.section.title }}
পেনাল্টি শুটআউটে বড় পরিবর্তন আনতে চায় ফিফা
ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব এখন উত্তেজনার চূড়ায়। শেষ ৩২-এর লড়াই, গোল্ডেন বুটের দৌড়, বড় দলগুলোর টিকে থাকার সমীকরণ-সব মিলিয়ে বিশ্ব ফুটবল এখন বিশ্বকাপ জ্বরে আক্রান্ত। ঠিক এমন সময় ফুটবল বিশ্বে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে একটি সম্ভাব্য নিয়ম পরিবর্তন।
নকআউট পর্ব শুরু হওয়ার আগেই পেনাল্টি শুটআটের নিয়ম পরিবর্তন করতে চায় ফিফা। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ইতোমধ্যে ফুটবলের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা আইএফএবি (IFAB)-এর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। বিষয়টি অনুমোদন পেলে বিশ্বকাপের শেষ ৩২ থেকেই নতুন নিয়ম কার্যকর হতে পারে।
ফুটবলের মতো শত বছরের ঐতিহ্যবাহী খেলায় বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে নিয়ম পরিবর্তনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। আর সেই কারণেই ফুটবল বিশ্বে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা।
বর্তমান নিয়ম কী?
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী নকআউট ম্যাচ ১২০ মিনিটেও নিষ্পত্তি না হলে ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুটআটে। শুটআট শুরু হওয়ার আগে দুটি কয়েন টস অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম টসে নির্ধারণ করা হয় কোন দল আগে পেনাল্টি নেবে। দ্বিতীয় টসে নির্ধারিত হয় কোন প্রান্তের গোলে শুটআট অনুষ্ঠিত হবে।
অনেক সময় একটি দল দুই সুবিধাই পেয়ে যায়। অর্থাৎ তারা আগে শট নেওয়ার সুযোগও পায়, আবার নিজেদের সমর্থকদের সামনে পেনাল্টি নেওয়ার সুযোগও পায়। ফিফার মতে, এখানেই রয়েছে একটি বড় অসাম্য।
নতুন নিয়মে কী পরিবর্তন আসবে?
ফিফার প্রস্তাব অনুযায়ী ভবিষ্যতে আর দুটি টস হবে না। শুধুমাত্র একটি কয়েন টস অনুষ্ঠিত হবে। টসে জয়ী দলের অধিনায়ক দুটি বিকল্পের মধ্যে একটি বেছে নিতে পারবেন। তিনি হয় আগে পেনাল্টি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন, অথবা কোন প্রান্তে শুটআট অনুষ্ঠিত হবে সেটি নির্বাচন করবেন। অন্য দল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাকি সুবিধাটি পাবে। অর্থাৎ কোনো দল একসঙ্গে দুই সুবিধা পাবে না।
ফিফা মনে করছে, এই পদ্ধতি পেনাল্টি শুটআটকে আরও ন্যায্য করে তুলবে।
আর্সেনাল-পিএসজি ফাইনালের পর শুরু আলোচনা
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক একটি বড় ফাইনালে একটি দল দুই টসেই জয় পাওয়ার পর নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় আসে। বিশেষ করে আর্সেনাল ও প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের পেনাল্টি শুটআট এই বিতর্ককে আরও উসকে দেয়। আর্সেনাল দুই টসেই হেরে যায়। ফলে তারা দ্বিতীয় শট নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিপক্ষ সমর্থকদের সামনে পেনাল্টি নিতে বাধ্য হয়। ফিফার অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, এই পরিস্থিতি এক দলের জন্য অযৌক্তিক বাড়তি সুবিধা তৈরি করে।
আগে শট নেওয়ার সুবিধা কতটা?
ফিফার আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সাম্প্রতিক গবেষণা। ২০২৩ সালের এক একাডেমিক গবেষণায় দেখা গেছে, যে দল পেনাল্টিতে আগে শট নেয় তাদের জয়ের সম্ভাবনা প্রায় ২২ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। গবেষকদের মতে, দ্বিতীয় শট নেওয়া দল সবসময় বাড়তি মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। যদিও ২০২১ সালের আরেকটি গবেষণায় এই সুবিধাকে মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ বলা হয়েছিল, তবুও ফিফা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
কোলিনার দীর্ঘদিনের দাবি
ফিফার রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কোলিনা দীর্ঘদিন ধরেই পেনাল্টি শুটআটকে আরও ন্যায্য করার পক্ষে মত দিয়ে আসছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা এই রেফারি মনে করেন, বর্তমান ব্যবস্থায় কিছু ক্ষেত্রে একটি দল অযৌক্তিক সুবিধা পেয়ে যায়। অতীতে এমন প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল যে দুই প্রান্তের গোলে পর্যায়ক্রমে পেনাল্টি নেওয়া হবে, যাতে কোনো দল সমর্থকদের বাড়তি সুবিধা না পায়।
তবে বাস্তবায়নের জটিলতার কারণে সেই প্রস্তাব এগোয়নি। এবার তুলনামূলক সহজ একটি সমাধানের দিকে এগোচ্ছে ফিফা।
বিশ্বকাপের মাঝপথে নিয়ম পরিবর্তন কতটা বিরল?
সাধারণত ফুটবলের নিয়ম পরিবর্তনের জন্য আইএফএবির বার্ষিক সভার অনুমোদন প্রয়োজন হয়। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে জরুরি বৈঠকের মাধ্যমে নিয়ম পরিবর্তনের নজিরও রয়েছে। বিশ্বকাপ শুরুর পর নিয়ম পরিবর্তনের ঘটনা খুবই বিরল। তাই ফিফার এই উদ্যোগ ফুটবল বিশ্বে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
যদি অনুমোদন পাওয়া যায়, তাহলে শেষ ৩২-এর প্রথম ম্যাচের আগেই নতুন নিয়ম কার্যকর হতে পারে।
ইতিহাসে পেনাল্টি শুটআট
বর্তমান ফুটবলে পেনাল্টি শুটআট একটি স্বাভাবিক বিষয় হলেও একসময় বিশ্বকাপে ম্যাচের ফল নির্ধারণ করা হতো কয়েন টস কিংবা লটারির মাধ্যমে। ১৯৭০-এর দশকে পেনাল্টি শুটআট আনুষ্ঠানিকভাবে ফুটবলের নিয়মে অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে বিশ্বকাপের শেষ ৩২, শেষ ১৬, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনালে ড্র হলে পেনাল্টি শুটআটের মাধ্যমেই বিজয়ী নির্ধারণ করা হয়।
২০২৬ বিশ্বকাপে পেনাল্টির গুরুত্ব আরও বাড়ছে
বিশ্বকাপে এখন ৪৮ দল অংশ নিচ্ছে। ফলে নকআউট পর্বে ম্যাচের সংখ্যাও বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত নকআউট ম্যাচ মানেই পেনাল্টি শুটআটের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বকাপ জয়ের পথে অনেক দলকেই অন্তত একটি পেনাল্টি শুটআট জিততে হতে পারে। ফলে পেনাল্টি এখন শুধু টাইব্রেকার নয়, অনেক দলের জন্য বিশ্বকাপ ভাগ্য নির্ধারণকারী অস্ত্রেও পরিণত হয়েছে।
এখনো চূড়ান্ত হয়নি সিদ্ধান্ত
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নিয়ম এখনো কার্যকর হয়নি। আইএফএবির অনুমোদন ছাড়া নতুন নিয়ম চালু করা সম্ভব নয়। ফিফা দ্রুত সিদ্ধান্ত চাইলেও চূড়ান্ত অনুমোদন এখনও বাকি রয়েছে। অর্থাৎ নকআউট পর্বে যদি কোনো ম্যাচ পেনাল্টি শুটআটে গড়ায়, তাহলে ফুটবল বিশ্ব হয়তো একেবারে নতুন একটি নিয়মের সাক্ষী হতে পারে। আর যদি অনুমোদন না মেলে, তাহলে পুরোনো নিয়মই বহাল থাকবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট-২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াই নয়, নিয়মের বইয়েও নতুন ইতিহাস লেখার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।