গোল্ডেন বুট লড়াইয়ে এগিয়ে তিন তারকা

গোল্ডেন বুট লড়াইয়ে এগিয়ে তিন তারকা
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

বিশ্বকাপের গল্প সাধারণত দলকে ঘিরেই লেখা হয়। কোনো কোনো আসরে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল কিংবা জার্মানির মতো দলগুলো হয়ে ওঠে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু কিছু কিছু বিশ্বকাপ আছে, যেখানে দলকে ছাপিয়ে সামনে চলে আসেন কয়েকজন ফুটবলার। তাদের পারফরম্যান্স, গোল, রেকর্ড এবং ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই পুরো আসরের রূপ বদলে দেয়।

২০২৬ বিশ্বকাপ এখন ঠিক সেরকমই একটি গল্পের দিকে এগোচ্ছে। এই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন তিনজন-লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং আর্লিং হ্যালান্ড। তিনজন তিন দেশের প্রতিনিধি, তিনজনের খেলার ধরন আলাদা, কিন্তু তাদের লক্ষ্য এক-গোল এবং ইতিহাস।

 

প্রতিটি ম্যাচের পর নতুন করে বদলে যাচ্ছে গোলদাতাদের তালিকা। কখনও এগিয়ে যাচ্ছেন মেসি, কখনও তার ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছেন এমবাপ্পে, আবার কখনও নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই আলো কেড়ে নিচ্ছেন হ্যালান্ড। ফলে এবারের বিশ্বকাপ শুধু দলগত সাফল্যের লড়াই নয়, বরং ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বেরও এক অসাধারণ প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।

 

মেসির পায়ে আর্জেন্টিনার সব গোল

ডালাসে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দুই গোল করে বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আলোচনায় পরিণত হয়েছেন লিওনেল মেসি। শুধু ম্যাচ জেতাননি, ভেঙে দিয়েছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ রেকর্ডগুলোর একটি। জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলকে পেছনে ফেলে মেসির বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা পৌঁছে গেছে ১৮-তে। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে এককভাবে জায়গা করে নিয়েছেন।

 

সবচেয়ে অবাক করা তথ্য হলো, এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত পাঁচটি গোল করেছে এবং পাঁচটিই এসেছে মেসির পা থেকে। ৩৮ বছর বয়সে এসে একটি দলের পুরো আক্রমণভাগ প্রায় একাই টেনে নেওয়ার ঘটনা আধুনিক ফুটবলে খুব কম দেখা যায়।

 

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে তার দ্বিতীয় গোলটি ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে। কয়েকজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে, ভারসাম্য ধরে রেখে এবং কঠিন কোণ থেকে গোল করে তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন যে বয়স এখনও তার প্রতিভাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

 

সময়ের সঙ্গে লড়াই করছেন মেসি

মেসির বর্তমান পারফরম্যান্স শুধু পরিসংখ্যানের গল্প নয়। এটি এমন এক ফুটবলারের গল্প, যিনি সময়ের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করছেন।

 

৩৮ বছর বয়সেও তার গতি, পাসিং, গোল করার ক্ষমতা এবং ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার সামর্থ্য এখনও বিশ্বমানের। অনেকেই মনে করেছিলেন কাতার বিশ্বকাপের পর জাতীয় দল থেকে ধীরে ধীরে সরে যাবেন মেসি। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে তিনি আবারও প্রমাণ করছেন, তার অধ্যায় এখনও শেষ হয়নি। আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমে তিনি এখন শুধু একজন ফুটবলার নন, বরং পুরো দলের অনুপ্রেরণা।

 

মেসির পেছনে এমবাপ্পে

মেসি যেখানে ইতিহাসের শীর্ষে, সেখানে তার ঠিক পেছনেই আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ইরাকের বিপক্ষে নিজের শততম আন্তর্জাতিক ম্যাচে জোড়া গোল করেছেন ফ্রান্সের অধিনায়ক। তিনটি বিশ্বকাপ মিলিয়ে তার গোলসংখ্যা এখন ১৬।

 

২০১৮ বিশ্বকাপে তিনি করেছিলেন চার গোল। ২০২২ সালে করেছিলেন আট গোল। আর ২০২৬ বিশ্বকাপে দুই ম্যাচেই চার গোল করে আবারও শিরোনামে উঠে এসেছেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে এই অবস্থানে পৌঁছানো অবিশ্বাস্য। মিরোস্লাভ ক্লোসা চারটি বিশ্বকাপ খেলে যে অবস্থানে পৌঁছেছিলেন, এমবাপ্পে সেখানে পৌঁছে গেছেন অনেক দ্রুত।

 

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সামনে তার আরও অন্তত দুটি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ রয়েছে। ফলে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড ভবিষ্যতে তার দখলে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

‘এটি এমবাপ্পের বিশ্বকাপও হতে পারে’

ফরাসি ফুটবল বিশ্লেষক জুলিয়েন লরেন্স মনে করেন, এবারের বিশ্বকাপটি এমবাপ্পেরও হতে পারে।

তার ভাষায়,

“আমার মনে হয় এই বিশ্বকাপটি এমবাপ্পের বিশ্বকাপ হতে পারে। কারণ সে এমন একটি রেকর্ডের পেছনে ছুটছে, যা এখন মেসির হাতে।” এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বর্তমান বাস্তবতা। মেসি শীর্ষে অবস্থান করছেন, কিন্তু এমবাপ্পে সেই অবস্থান দখল করার জন্য নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০১৮ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং ২০২২ সালে রানার্সআপ হওয়া এমবাপ্পে এখন ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় ভরসা।

 

অবহেলার জবাব দিচ্ছেন হ্যালান্ড

বিশ্বকাপ শুরুর আগে গোল্ডেন বুটের সম্ভাব্য লড়াইয়ে মেসি, এমবাপ্পে কিংবা রোনালদোর নাম থাকলেও আর্লিং হ্যালান্ডকে অনেকেই পিছিয়ে রেখেছিলেন। সম্ভবত সেই অবহেলার জবাবই দিচ্ছেন নরওয়ের এই স্ট্রাইকার। নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নেমেই টানা দুই ম্যাচে জোড়া গোল করেছেন হ্যালান্ড। ফলে চলতি বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা এখন চার।

 

নরওয়ের হয়ে ৫২ ম্যাচে ৫৯ গোল করা এই স্ট্রাইকারের আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানই অবিশ্বাস্য। কিন্তু বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে চার গোল করে তিনি নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসেও নতুন রেকর্ড গড়েছেন।

 

প্রথম বিশ্বকাপেই ইতিহাস

হ্যালান্ডের শক্তি, গতি এবং ফিনিশিং এখন প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। স্কটল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার অ্যালি ম্যাককয়েস্ট বলেছেন, “প্রাকৃতিক প্রতিভার বিচারে মেসি সবার ওপরে। তার পরেই এমবাপ্পে। কিন্তু গোল করার কথা বললে হ্যালান্ডের সমকক্ষ কেউ নেই।”

 

এই মন্তব্যই হয়তো সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে হ্যালান্ডের বর্তমান অবস্থান। মেসি ম্যাচ তৈরি করেন, এমবাপ্পে গতি দিয়ে ম্যাচ ভাঙেন, আর হ্যালান্ড সুযোগ পেলেই বল জালে পাঠান।

 

গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে আরও যারা আছেন

যদিও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন এই তিনজন, তবুও গোল্ডেন বুটের লড়াই এখন আর কেবল মেসি, এমবাপ্পে ও হ্যালান্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জাপানের আয়াসে উয়েদা ইতোমধ্যে তিন গোল করেছেন। তিউনিসিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি জাপানের আক্রমণের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছেন।

 

ক্রোয়েশিয়ার আন্তে বুদিমিরও তিন গোল নিয়ে রয়েছেন শীর্ষ গোলদাতাদের তালিকায়। পানামার বিপক্ষে জয়সূচক গোল করে তিনি বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতার রেকর্ডও গড়েছেন। ব্রাজিলের রাফিনিয়া তিন গোল করে দারুণ ছন্দে রয়েছেন। ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেনও গোলের খাতা খুলেছেন। আর্জেন্টিনার হুলিয়ান আলভারেজ, ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং জার্মানির জামাল মুসিয়ালাও পিছিয়ে নেই।

 

বর্তমান গোলদাতাদের তালিকা

দুই ম্যাচ শেষে বিশ্বকাপের শীর্ষ গোলদাতারা হলেন-

  • লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা) - ৫ গোল
  • কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স) - ৪ গোল
  • আর্লিং হ্যালান্ড (নরওয়ে) - ৪ গোল
  • আয়াসে উয়েদা (জাপান) - ৩ গোল
  • আন্তে বুদিমির (ক্রোয়েশিয়া) - ৩ গোল
  • রাফিনিয়া (ব্রাজিল) - ৩ গোল
  • হ্যারি কেন (ইংল্যান্ড) - ২ গোল
  • হুলিয়ান আলভারেজ (আর্জেন্টিনা) - ২ গোল
  • ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (ব্রাজিল) - ২ গোল
  • জামাল মুসিয়ালা (জার্মানি) - ২ গোল।


ইতিহাসের বিরল এক গোলযুদ্ধ

বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচ শেষে তিনজন ফুটবলারের চার বা তার বেশি গোল করার ঘটনা খুবই বিরল। সর্বশেষ এমন ঘটনা দেখা গিয়েছিল ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে। সেই আসরে হাঙ্গেরির সান্দর কচিস ১১ গোল করেছিলেন। পরে ১৯৫৮ সালে ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন ১৩ গোল করে এক আসরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েন, যা আজও অক্ষত রয়েছে।

 

২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের রোনালদো করেছিলেন আট গোল। ২০১৪ সালে হামেস রদ্রিগেজ ছয় গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন। ২০১৮ সালে হ্যারি কেন করেছিলেন ছয় গোল। ২০২২ সালে এমবাপ্পে আট গোল করে গোল্ডেন বুট নিজের করে নেন। এবার প্রশ্ন উঠছে-জাস্ট ফন্টেইনের ১৩ গোলের রেকর্ড কি এবার হুমকির মুখে?

 

নতুন প্রজন্মের নির্ভীক ফুটবল

ফ্রান্সের সাবেক ডিফেন্ডার গায়েল ক্লিশি বলেছেন, “এমবাপ্পেদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তারা বয়স দেখে সম্মান করে না, পারফরম্যান্স দেখে সম্মান করে।” এই মন্তব্য শুধু এমবাপ্পের জন্য নয়, হ্যালান্ডের ক্ষেত্রেও সত্য। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, ৩৮ বছর বয়সেও মেসি যেন একই মানসিকতা নিয়ে খেলছেন। তিনি এখনও ক্ষুধার্ত, এখনও নতুন রেকর্ডের পেছনে ছুটছেন, এখনও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিচ্ছেন।

 

বিশ্বকাপের নতুন গল্প

যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুন হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “মেসি, এমবাপ্পে আর হ্যালান্ডকে দেখে বিরক্ত লাগে। ওরা যেন অবধারিতভাবেই গোল করবে!” সম্ভবত বর্তমান বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা এটিই। প্রতিটি ম্যাচে নতুন করে লেখা হচ্ছে এই তিন তারকার গল্প। কখনও মেসি ইতিহাস লিখছেন, কখনও এমবাপ্পে তাকে তাড়া করছেন, আবার কখনও হ্যালান্ড নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই রেকর্ড গড়ছেন।

 

শেষ পর্যন্ত এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় নায়ক কে হবেন? গোল্ডেন বুট কার হাতে উঠবে? মেসি কি নিজের রেকর্ড আরও উঁচুতে নিয়ে যাবেন? এমবাপ্পে কি ইতিহাসের নতুন উত্তরসূরি হবেন? নাকি হ্যালান্ড নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই সবাইকে পেছনে ফেলবেন?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও সময়ের হাতে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত-২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় লড়াই এখন শুধু দলগুলোর নয়, বরং মেসি, এমবাপ্পে এবং হ্যালান্ডের গোলের মহারণ।


সম্পর্কিত নিউজ