বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বেই বিদায় যেসব দলের

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বেই বিদায় যেসব দলের
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে নকআউট পর্বের সমীকরণ। কয়েকটি দল ইতোমধ্যে শেষ ৩২ নিশ্চিত করার পথে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে, আবার কয়েকটি দলের জন্য দুই ম্যাচ খেলতেই শেষ হয়ে গেছে বিশ্বকাপের স্বপ্ন। চলতি আসরে সবচেয়ে হতাশাজনক বিদায়গুলোর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, তিউনিসিয়া ও পানামার নাম। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন পর বিশ্বকাপে ফেরা হাইতি এবং নবাগত জর্ডানও বিদায়ের কাতারে যোগ দিয়েছে।

দুই ম্যাচ শেষে কোনো পয়েন্ট না পাওয়া এই পাঁচ দলই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিশ্চিত করেছে। তবে তাদের বিদায়ের গল্প এক নয়। কেউ প্রত্যাশার ভারে ভেঙে পড়েছে, কেউ গোলের দেখা না পেয়ে ছিটকে গেছে, আবার কেউ হারলেও লড়াই করে সমর্থকদের মন জয় করেছে।

 

ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে শেষ পানামার বিশ্বকাপ

গ্রুপ ‘এল’-এ টিকে থাকার লড়াইয়ে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল পানামা। ম্যাচটি ছিল মধ্য আমেরিকার দেশটির জন্য বাঁচা-মরার লড়াই। কিন্তু শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সাহসী ফুটবল খেলেও শেষ পর্যন্ত ১-০ গোলের পরাজয় মেনে নিতে হয় তাদের।

 

বৃষ্টিভেজা টরন্টো স্টেডিয়ামে ম্যাচের প্রথমার্ধে ক্রোয়েশিয়াকে বেশ চাপে রাখে পানামা। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ২৯ ধাপ পিছিয়ে থাকা দলটি কয়েকবার গোলের সুযোগও তৈরি করে। তবে দ্বিতীয়ার্ধে কোচ জ্লাতকো দালিচের কৌশলগত পরিবর্তন ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

 

৫৪ মিনিটে ইয়োসিপ স্তানিসিচের ক্রসে আন্তে বুদিমিরের একমাত্র গোলেই জয় পায় ক্রোয়েশিয়া। গোল হজমের পরও হাল ছাড়েনি পানামা। দ্বিতীয়ার্ধে অন্তত দুটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল তারা। কিন্তু ক্রোয়াট গোলরক্ষক দমিনিক লিভাকোভিচ দুর্দান্ত সেভ করে দলকে রক্ষা করেন।

 

টানা দুই হারে কোনো পয়েন্ট ছাড়াই গ্রুপের তলানিতে নেমে যায় পানামা। এর মাধ্যমে ২০১৮ সালের পর আবারও দ্বিতীয় ম্যাচের পরই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিশ্চিত হয় দেশটির।

 

শটের পর শট, তবুও গোল নেই তুরস্কের

চলতি বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় হতাশার নাম হয়তো তুরস্ক। অনেক ফুটবল বিশ্লেষক তাদের আসরের অন্যতম ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তরুণ তারকা আর্দা গুলার, কেনান ইলদিজ, ওরকুন কোকচুদের নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখেছিল দেশটির সমর্থকেরা। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

 

দুই ম্যাচে প্রতিপক্ষের গোলবার লক্ষ্য করে সর্বোচ্চ ৬২টি শট নিয়েও একবারও গোল করতে পারেনি তুরস্ক। প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ২-০ গোলে হারের পর দ্বিতীয় ম্যাচে ১০ জনের প্যারাগুয়ের বিপক্ষেও গোলশূন্য ড্র করে তারা।

 

আক্রমণে আধিপত্য, বল দখলে এগিয়ে থাকা কিংবা সুযোগ তৈরি-সবকিছুই ছিল তুরস্কের পক্ষে। কিন্তু গোলের সামনে চরম ব্যর্থতা তাদের বিশ্বকাপ শেষ করে দেয়।

 

বিশ্বকাপ ইতিহাসে ১৯৬৬ সালের পর এত বেশি শট নিয়ে গোল না করার ঘটনা আর দেখা যায়নি। ফলে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য তুরস্কের বিদায় ছিল সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাগুলোর একটি।

 

৫২ বছর পর ফিরেও হাসতে পারল না হাইতি

দীর্ঘ ৫২ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল হাইতি। ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশটি বিশ্বকাপে ফেরার আনন্দে ভাসলেও মাঠের লড়াইয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হারের পর দ্বিতীয় ম্যাচে ব্রাজিলের বিপক্ষে ৩-০ গোলের বড় পরাজয় তাদের বিদায় নিশ্চিত করে।

 

দুই ম্যাচে কোনো গোল করতে না পারা ছিল হাইতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। তবে দলটির লড়াকু মানসিকতা এবং রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা অনেক সময় প্রতিপক্ষকে ভুগিয়েছে। অভিজ্ঞতার অভাব এবং বড় মঞ্চের চাপ শেষ পর্যন্ত তাদের পথচলা থামিয়ে দেয়।

 

বিশ্বকাপে ফিরে অন্তত একটি পয়েন্ট কিংবা একটি গোলের প্রত্যাশা ছিল দেশটির সমর্থকদের। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি।

 

কোচ বদলিয়েও বদলালো না তিউনিসিয়ার ভাগ্য

তিউনিসিয়ার জন্য বিশ্বকাপ ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। প্রথম ম্যাচে সুইডেনের কাছে ৫-১ গোলের বড় পরাজয়ের পর কোচ সাবরি লামুশিকে বরখাস্ত করে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন। তার জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয় অভিজ্ঞ ফরাসি কোচ হার্ভে রেনার্ডকে। আফ্রিকার ফুটবলে সফল এই কোচকে ঘিরে নতুন আশার জন্ম হয়েছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের প্রস্তুতিতে তিনি দলের ভাগ্য বদলাতে পারেননি।

 

বিশ্বকাপ ইতিহাসের এক হাজারতম ম্যাচে জাপানের মুখোমুখি হয়েছিল তিউনিসিয়া। কিন্তু আয়াসে উয়েদার দুর্দান্ত নৈপুণ্যে জাপানের কাছে ৪-০ গোলের বড় ব্যবধানে হারে আফ্রিকার দলটি। টানা দুই ম্যাচে ৯ গোল হজম করে কোনো পয়েন্ট ছাড়াই বিদায় নেয় তিউনিসিয়া। কোচ পরিবর্তনের পরও দলের রক্ষণভাগের দুর্বলতা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

 

হারলেও প্রশংসা কুড়িয়েছে জর্ডান

বিদায় নেওয়া দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ইতিবাচক গল্প হয়তো জর্ডানের। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি কঠিন গ্রুপে পড়েও লড়াই করে নজর কেড়েছে। আর্জেন্টিনা, অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার মতো শক্তিশালী দলের সঙ্গে একই গ্রুপে পড়েছিল জর্ডান। অনেকে তাদের বড় ব্যবধানে হারার আশঙ্কা করেছিলেন। কিন্তু মাঠে তারা ভিন্ন চিত্র উপহার দেয়।

 

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আলি ওলওয়ানের গোলে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের প্রথম গোল পায় জর্ডান। পরে আলজেরিয়ার বিপক্ষেও নিজার আল রাশদানের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল দলটি। যদিও শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় তারা, তবে দুই ম্যাচেই জর্ডানের লড়াই প্রশংসা কুড়িয়েছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিয়ে বিদায় নিয়েছে দেশটি।

 

নকআউটের লড়াই আরও জমে উঠছে

গ্রুপ পর্বের দুই রাউন্ড শেষ হওয়ার আগেই পাঁচটি দলের বিদায় নিশ্চিত হওয়ায় নকআউটের সমীকরণ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। অনেক গ্রুপে শেষ ম্যাচগুলো এখন কার্যত নকআউট ম্যাচে পরিণত হয়েছে। ক্রোয়েশিয়া এখনও শেষ ষোলে ওঠার লড়াইয়ে টিকে আছে। ঘানার বিপক্ষে শেষ ম্যাচে জয় পেলেই তারা পরের পর্বে জায়গা করে নিতে পারবে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড, জাপান ও ব্রাজিলের মতো দলগুলো নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে।

 

অন্যদিকে তুরস্ক, তিউনিসিয়া, পানামা, হাইতি ও জর্ডানের জন্য বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হলেও তাদের গল্প একেক রকম শিক্ষা দিয়ে গেল। কেউ সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি, কেউ অভিজ্ঞতার অভাবে পিছিয়ে পড়েছে, আবার কেউ পরাজিত হয়েও ভবিষ্যতের সম্ভাবনার বার্তা রেখে গেছে।

 

বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিটি ম্যাচ যেমন নতুন নায়ক তৈরি করে, তেমনি কিছু স্বপ্নেরও সমাপ্তি ঘটায়। এবারের গ্রুপ পর্বে সেই অপূর্ণ স্বপ্নের তালিকায় যোগ হলো পাঁচটি দেশের নাম।

 

বিদায় নিশ্চিত হওয়া দলগুলো: তুরস্ক, তিউনিসিয়া, পানামা, হাইতি ও জর্ডান।


সম্পর্কিত নিউজ