{{ news.section.title }}
শেষ মুহূর্তের গোলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিদায় করল কানাডা
লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে ইতিহাস লিখেছে কানাডা। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে নাটকীয় জয়ে প্রথমবারের মতো পৌঁছে গেছে শেষ ষোলোতে। নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছিল, তখনই স্টিভেন ইউস্টাকিওর দুর্দান্ত গোল দক্ষিণ আফ্রিকার স্বপ্ন ভেঙে দেয়। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে করা সেই গোলেই ১-০ ব্যবধানে জিতে নতুন ইতিহাস গড়ে জেসি মার্শের দল।
এই ম্যাচটি ছিল শুধু রাউন্ড অব ৩২-এর উদ্বোধনী ম্যাচই নয়, দুই দলের জন্যই ছিল এক বিশেষ উপলক্ষ। কানাডা এবং দক্ষিণ আফ্রিকা-দুই দলই অতীতে একাধিকবার বিশ্বকাপে অংশ নিলেও কখনো নকআউট পর্বে জয়ের স্বাদ পায়নি। ফলে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটের লড়াইয়ে দুই দলই ছিল সমান মরিয়া।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখলে এগিয়ে ছিল কানাডা। জনাথন ডেভিড, তেজন বুকানান এবং তানি ওলুওয়াসেয়িকে নিয়ে আক্রমণ সাজাতে থাকে উত্তর আমেরিকার দেশটি। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণভাগ শুরু থেকেই ছিল অত্যন্ত সংগঠিত। অধিনায়ক রনওয়েন উইলিয়ামস গোলবারের নিচে দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলছিলেন।
প্রথম ২০ মিনিটে কানাডা কয়েকটি কর্নার পেলেও সেগুলো থেকে গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। দক্ষিণ আফ্রিকা পাল্টা আক্রমণের কৌশল নিয়ে খেলছিল। থেম্বা জোয়ানে এবং পার্সি তাউয়ের গতি কাজে লাগিয়ে কয়েকবার তারা কানাডার রক্ষণে চাপ তৈরি করার চেষ্টা করে।
৪৪ মিনিটে ম্যাচের অন্যতম সেরা সুযোগ পায় কানাডা। কর্নার থেকে আসা বলে মোয়িজ বোম্বিতোর হেড প্রায় গোললাইন পেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু অসাধারণ ক্লিয়ারেন্সে দক্ষিণ আফ্রিকাকে রক্ষা করেন অব্রে মদিবা। ফিরতি বলে তেজন বুকানানের শটও দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন রনওয়েন উইলিয়ামস।
প্রথমার্ধের শেষদিকে রিচি লারিয়া বক্সের ভেতরে পড়ে গেলে কানাডা পেনাল্টির দাবি জানায়। রেফারি ভিএআরের সহায়তা নিলেও শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি দেননি। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হন কানাডার কোচ জেসি মার্শ। বিরতিতে যাওয়ার সময় তাঁকে রেফারির সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়।
দ্বিতীয়ার্ধে দক্ষিণ আফ্রিকা আরও রক্ষণাত্মক হয়ে যায়। কোচ হুগো ব্রুস অতিরিক্ত সময়ের কথা মাথায় রেখে দলকে অনেকটা নিচে নামিয়ে খেলান। এতে কানাডা বলের দখল আরও বেশি পায়।
৬১ মিনিটে জনাথন ডেভিডের পাসে এককভাবে গোলরক্ষকের সামনে চলে যান তানি ওলুওয়াসেয়ি। কিন্তু রনওয়েন উইলিয়ামস অসাধারণ সেভ করে দলকে বাঁচান। ফিরতি বলে ডেভিডের শটও ব্লক করেন এমবেকেজেলি এমবোকাজি।
ম্যাচের ৭০ মিনিটের পর কানাডা তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আলফন্সো ডেভিসকে মাঠে নামায়। চোটের কারণে পুরো গ্রুপ পর্বে নিয়মিত খেলতে পারেননি বায়ার্ন মিউনিখের এই তারকা। তাঁর গতি এবং ড্রিবলিং কানাডার আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করলেও দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণ ভাঙা যাচ্ছিল না।
দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস। পুরো ম্যাচে তিনি একের পর এক সেভ করে দলকে লড়াইয়ে রাখেন। কানাডার একাধিক আক্রমণ ঠেকিয়ে তিনি ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হওয়ার পর পাঁচ মিনিট অতিরিক্ত সময় যোগ করেন রেফারি। তখনও মনে হচ্ছিল ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়াবে। কিন্তু ৯২ মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত, যা বদলে দেয় পুরো গল্প।
অ্যালিস্টার জনস্টনের ক্রস দক্ষিণ আফ্রিকার একজন ডিফেন্ডার হেড করে বক্সের বাইরে পাঠিয়ে দেন। সেখানে অপেক্ষা করছিলেন স্টিভেন ইউস্টাকিও। বুক দিয়ে বল নিয়ন্ত্রণ করে এক মুহূর্ত দেরি না করে নিচু শটে বল জালে পাঠিয়ে দেন কানাডার অধিনায়ক।
রনওয়েন উইলিয়ামস ডাইভ দিলেও সেই শট ঠেকাতে পারেননি। গোলের সঙ্গে সঙ্গেই পুরো স্টেডিয়াম উল্লাসে ফেটে পড়ে। বেঞ্চ থেকে ছুটে আসেন কানাডার খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফরা।
পরিসংখ্যানেও কানাডার আধিপত্য স্পষ্ট ছিল। বলের দখল, কর্নার, শট এবং আক্রমণের সংখ্যায় তারা এগিয়ে ছিল। জনাথন ডেভিড, তেজন বুকানান ও ইউস্টাকিও মাঝমাঠ থেকে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য সবচেয়ে বড় হতাশা হলো শেষ মুহূর্তে গোল হজম। পুরো ম্যাচে রক্ষণাত্মক পরিকল্পনা সফল হলেও একটি ভুলই তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ করে দেয়। অধিনায়ক উইলিয়ামস পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেও পরাজয় এড়াতে পারেননি।
এই জয়ের মাধ্যমে কানাডা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিল। এর আগে ১৯৮৬ এবং ২০২২ বিশ্বকাপে তারা গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি। এবার স্বাগতিক দেশের সমর্থকদের সামনে নতুন ইতিহাস লিখেছে তারা।
এখন কানাডার সামনে আরও বড় পরীক্ষা। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ হবে নেদারল্যান্ডস অথবা মরক্কো। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের এই জয় কানাডার আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক বড় দল শেষ মুহূর্তের গোলে নতুন অধ্যায় লিখেছে। এবার সেই তালিকায় নিজের নাম যোগ করল কানাডাও। আর স্টিভেন ইউস্টাকিওর সেই ৯২ মিনিটের শট হয়তো বহু বছর ধরে কানাডিয়ান ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে।