১৯৯৮-এর সেই দুঃস্বপ্ন, এবার কি বদলাবে ব্রাজিল?

১৯৯৮-এর সেই দুঃস্বপ্ন, এবার কি বদলাবে ব্রাজিল?
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের সামনে এবার এমন এক প্রতিপক্ষ, যাদের বিপক্ষে ইতিহাস কখনোই হাসেনি সেলেসাওদের দিকে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে কার্লো আনচেলত্তির দলের প্রতিপক্ষ নরওয়ে-একটি দল, যাদের বিপক্ষে এখন পর্যন্ত চারবার খেলেও একবারও জয়ের মুখ দেখেনি ব্রাজিল। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল দলের জন্য এমন পরিসংখ্যান সত্যিই বিরল। আর সেই কারণেই বিশ্বজুড়ে এই ম্যাচকে শুধু শেষ ষোলোর লড়াই নয়, বরং ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের এক 'অভিশাপ' ভাঙার সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স লিখেছে, ২০২৬ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত নিজেদের সেরা ছন্দে পৌঁছে যাওয়া ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হতে পারে নরওয়ে। কারণ, ইতিহাস যেমন তাদের বিপক্ষে, তেমনি বর্তমান নরওয়ে দলটিও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। বিশেষ করে আর্লিং হালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দলটি এখন ইউরোপের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগের একটি।

 

দুই দলের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯৮৮ সালের ২৮ জুলাই। নরওয়ের উলেভাল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র হয়েছিল। তখনও খুব কম মানুষই ধারণা করতে পেরেছিলেন, ভবিষ্যতে এই ছোট্ট ইউরোপীয় দেশটি ব্রাজিলের জন্য এত বড় ধাঁধা হয়ে উঠবে।

 

এর প্রায় নয় বছর পর, ১৯৯৭ সালের ৩০ মে, অসলোতে আবার মুখোমুখি হয় দুই দল। সেদিন ঘটে বড় চমক। রোমারিও, রোনালদো, দুঙ্গাদের নিয়ে গড়া শক্তিশালী ব্রাজিলকে ৪-২ গোলে হারিয়ে দেয় নরওয়ে। সেই জয় এখনো নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

কিন্তু ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি অবশ্য ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ।

 

গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ব্রাজিলের একটি ড্রই যথেষ্ট ছিল গ্রুপসেরা হওয়ার জন্য। অন্যদিকে নকআউটে যেতে নরওয়ের প্রয়োজন ছিল জয়। মার্সেইয়ে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ১-১ সমতা ছিল। শেষদিকে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার জুনিয়র বাইয়ানোর ফাউলে পেনাল্টি পায় নরওয়ে। ৮৮ মিনিটে কিয়েতিল রেকদাল স্পট-কিক থেকে গোল করে ২-১ ব্যবধানে জয় এনে দেন। সেই জয়ে শুধু নকআউটই নিশ্চিত হয়নি, বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনেরও জন্ম হয়েছিল। ব্রাজিলের বিপক্ষে এটিই নরওয়ের সবচেয়ে ঐতিহাসিক জয় হিসেবে ধরা হয়।

 

এরপর ২০০৬ সালের আগস্টে অসলোতে আবারও দেখা হয় দুই দলের। সেই প্রীতি ম্যাচও ১-১ গোলে ড্র হয়। জন আরনে রিসের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল নরওয়ে, পরে ব্রাজিলের হয়ে সমতা ফেরান রবিনহো। সেই ম্যাচের পর দীর্ঘ ২০ বছর আর মুখোমুখি হয়নি দুই দল।

 

ফলে এখন পর্যন্ত চার দেখায় নরওয়ের দুটি জয় ও দুটি ড্র। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিপক্ষে অপরাজিত থাকার এমন রেকর্ড বিশ্বের খুব কম দলেরই আছে। ফিফার ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানেও উল্লেখ করা হয়েছে, ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রথম তিন ম্যাচে অপরাজিত থাকা প্রথম দল ছিল নরওয়ে।

 

তবে ইতিহাসের পাশাপাশি বর্তমান ফর্মও ম্যাচটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

 

কার্লো আনচেলত্তির অধীনে শুরুতে কিছুটা ছন্দহীন থাকলেও এখন আত্মবিশ্বাসী ব্রাজিল। গ্রুপ পর্বে মরক্কোর সঙ্গে ড্র করার পর হাইতি ও স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা। এরপর রাউন্ড অব ৩২-এ জাপানের বিপক্ষে পিছিয়ে থেকেও ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়। ইনজুরি টাইমে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির গোল ব্রাজিলকে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে। মাঝমাঠে ব্রুনো গিমারাইসের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স এবং তাঁর চারটি অ্যাসিস্ট ইতোমধ্যে টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

 

ব্রাজিলের জন্য আরও স্বস্তির খবর, ইনজুরি কাটিয়ে রাফিনিয়া আবার অনুশীলনে ফিরেছেন। ফলে আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ম্যাথিউস কুনহা, মার্তিনেল্লি, রাফিনিয়া এবং ধীরে ধীরে ফিট হয়ে ওঠা নেইমারকে নিয়ে আনচেলত্তির সামনে বাড়তি বিকল্প তৈরি হয়েছে। তবে এতে একাদশ নির্বাচন নিয়ে তাঁর নতুন দোটানাও তৈরি হয়েছে। তরুণ রায়ান জাপানের বিপক্ষে দুর্দান্ত খেলায় নিজের জায়গার দাবি আরও শক্ত করেছেন।

 

অন্যদিকে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা নরওয়ে দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে নামছে। গ্রুপ পর্বে তারা ইরাককে ৪-১ এবং সেনেগালকে ৩-২ গোলে হারায়। যদিও শেষ ম্যাচে ফ্রান্সের কাছে ৪-১ ব্যবধানে হেরে রানার্সআপ হয়। এরপর রাউন্ড অব ৩২-এ আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ নকআউটে জয় পায় নরওয়ে। সেই ম্যাচেই জাতীয় দলের হয়ে ৬০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন আর্লিং হালান্ড। অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডও পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন।

 

নরওয়ের কোচ স্তালে সলবাকেনও ম্যাচের আগে ব্রাজিলকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছেন। তিনি বলেন, কার্লো আনচেলত্তি বিশ্বের অন্যতম সেরা কোচ এবং তাঁর দলের বিপক্ষে খেলতে হলে নিখুঁত পারফরম্যান্স প্রয়োজন হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি বিশ্বাস করেন, ইতিহাস তাঁর খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস যোগাবে।

 

ম্যাথিউস কুনহাও সতর্ক করেছেন সতীর্থদের। তাঁর মতে, শুধু হালান্ডকে আটকালেই হবে না; পুরো নরওয়ে দলই অত্যন্ত সংগঠিত এবং শারীরিকভাবে শক্তিশালী। তাই ব্রাজিলকে নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতেই হবে।

 

আগের চার ম্যাচের ইতিহাস ব্রাজিলের পক্ষে নয়। তবে নকআউট ফুটবলে ইতিহাস নয়, বর্তমানই সবচেয়ে বড় সত্য। তবুও একথা অস্বীকার করার উপায় নেই-ব্রাজিলের সামনে এবার শুধু কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার চ্যালেঞ্জ নয়, প্রায় চার দশকের পুরোনো এক অস্বস্তিকর রেকর্ড ভাঙার লড়াইও অপেক্ষা করছে।

 

৫ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে তাই শুধু দুই দলের লড়াই হবে না; মুখোমুখি হবে ইতিহাস বনাম বর্তমান। আর বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের চোখ থাকবে, ব্রাজিল অবশেষে নরওয়ের বিপক্ষে প্রথম জয় পায়, নাকি হালান্ডদের হাত ধরে আরও দীর্ঘ হয় সেলেসাওদের অপেক্ষা।


সম্পর্কিত নিউজ