হলান্ডের জোড়া গোলে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোয়ার্টারে নরওয়ে

হলান্ডের জোড়া গোলে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোয়ার্টারে নরওয়ে
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, কোটি কোটি সমর্থকের স্বপ্ন ছিল ‘হেক্সা’ জয়ের। কিন্তু সেই স্বপ্ন থেমে গেল শেষ ষোলোর মঞ্চেই। আর্লিং হলান্ডের দুর্দান্ত জোড়া গোলে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়ে ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে নরওয়ে।

নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ম্যাথেউস কুনহা ও ব্রুনো গিমারাইসকে ঘিরে একের পর এক আক্রমণ সাজায় কার্লো আনচেলত্তির দল। ম্যাচের শুরুতেই বড় সুযোগও পেয়ে যায় সেলেসাওরা। বক্সের ভেতরে ফাউলের পর পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। কিন্তু স্পটকিক থেকে ব্রুনো গিমারাইসের শট অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন নরওয়ের গোলরক্ষক অরইয়ান নিল্যান্ড। পরে ম্যাচ শেষে অনেক বিশ্লেষকই এই সেভকেই পুরো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।

 

পেনাল্টি মিসের ধাক্কা কাটিয়ে আবারও আক্রমণে ওঠে ব্রাজিল। তরুণ ফরোয়ার্ড এনদ্রিক একটি সহজ সুযোগ নষ্ট করেন। ভিনিসিয়ুসের কয়েকটি দারুণ দৌড়ও শেষ পর্যন্ত ফল এনে দিতে পারেনি। অন্যদিকে নরওয়ে শুরুতে কিছুটা রক্ষণাত্মক থাকলেও ধীরে ধীরে ম্যাচের ছন্দ নিজেদের দিকে নিয়ে আসে। কোচ স্টালে সলবাক্কেনের পরিকল্পনা ছিল বলের দখল ধরে রেখে ব্রাজিলকে ক্লান্ত করে তোলা। সেই পরিকল্পনাই সফল হয়। পুরো ম্যাচে প্রায় ৬৬ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা।

 

প্রথমার্ধ গোলশূন্য শেষ হলেও দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের গতি পাল্টে যায়। বিরতির পর সলবাক্কেনের কৌশলগত পরিবর্তন নরওয়ের খেলায় নতুন গতি এনে দেয়। বিশেষ করে আন্দ্রেয়াস স্কেলদেরুপ মাঠে নামার পর আক্রমণে ধার বাড়তে থাকে। তাঁর বাম দিকের ক্রস থেকেই ৭৯তম মিনিটে ছয় ফুট পাঁচ ইঞ্চি লম্বা আর্লিং হলান্ড দুর্দান্ত হেডে আলিসনকে পরাস্ত করে নরওয়েকে এগিয়ে দেন।

 

গোল হজমের পর ঝাঁপিয়ে পড়ে ব্রাজিল। আনচেলত্তি বেঞ্চ থেকে নেইমারকে নামিয়ে আক্রমণভাগে আরও শক্তি যোগ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু নরওয়ের সুশৃঙ্খল রক্ষণ এবং নিল্যান্ডের আত্মবিশ্বাসী গোলকিপিংয়ের সামনে ব্রাজিল বারবার ব্যর্থ হয়। ম্যাচের ৯০তম মিনিটে আবারও আঘাত হানে নরওয়ে। মাঝমাঠে বল পুনরুদ্ধার করে স্কেলদেরুপ নিচু পাস বাড়ান হলান্ডের দিকে। বক্সের বাইরে থেকে সময় নষ্ট না করে ডান পায়ের নিচু শটে বল জালে জড়িয়ে দেন ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার। দুই গোলের ব্যবধানে এগিয়ে যায় নরওয়ে।

 

যোগ করা সময়ের গভীরে ব্রাজিল পেনাল্টি পেলে স্পটকিক থেকে গোল করেন নেইমার। তবে সেটি কেবল ব্যবধান কমিয়েছে। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই উৎসবে মেতে ওঠে নরওয়ে। অন্যদিকে হতাশায় ভেঙে পড়েন ব্রাজিলের ফুটবলাররা।

 

এই জয়ে নরওয়ে শুধু কোয়ার্টার ফাইনালেই ওঠেনি, নিজেদের ফুটবল ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় লিখেছে। এর আগে কখনোই তারা বিশ্বকাপের শেষ আটে খেলতে পারেনি। ১৯৯৮ সালের পর বিশ্বকাপে ফিরে এবার সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ল স্টালে সলবাক্কেনের দল। শেষ আটে তাদের প্রতিপক্ষ হবে মেক্সিকো অথবা ইংল্যান্ড।

 

অন্যদিকে ব্রাজিলের জন্য এটি এক বেদনাদায়ক পরিসংখ্যান। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হলো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ১৯৯৪ থেকে শুরু করে টানা প্রতিটি বিশ্বকাপেই তারা অন্তত শেষ আটে খেলেছিল। সেই ধারার অবসান ঘটল নরওয়ের কাছে।

 

ম্যাচ শেষে নরওয়ে কোচ স্টালে সলবাক্কেন বলেন, ম্যাচের আগে তিনি খেলোয়াড়দের জানিয়েছিলেন, এটি ৫০-৫০ লড়াই না হলেও নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারলে ব্রাজিলকে হারানোর বাস্তব সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, দলটি ঠিক সেটাই করেছে এবং প্রতিটি খেলোয়াড় নিজেদের দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করেছে।

 

অন্যদিকে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি স্বীকার করেন, তাঁর দল যথেষ্ট সুযোগ তৈরি করলেও সেগুলো কাজে লাগাতে পারেনি। তিনি ব্রুনো গিমারাইসকে পেনাল্টি নেওয়ার সিদ্ধান্তেরও পক্ষে অবস্থান নেন এবং বলেন, ভবিষ্যতের জন্য এই হার থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

 

ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও স্মরণীয় এক রাত কাটিয়েছেন আর্লিং হলান্ড। জোড়া গোল করে চলতি বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতে। এর ফলে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তিনি লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের সমকক্ষ হয়ে গেলেন। নকআউট পর্বে এমন পারফরম্যান্সের পর এখন গোল্ডেন বুটের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদারও হয়ে উঠেছেন নরওয়ের এই গোলমেশিন।


সম্পর্কিত নিউজ