বিশ্বকাপে আলোচিত পেনাল্টি মিস: তালিকায় যেসব কিংবদন্তি

বিশ্বকাপে আলোচিত পেনাল্টি মিস: তালিকায় যেসব কিংবদন্তি
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ফুটবলে গোল করার সবচেয়ে বড় সুযোগগুলোর একটি হলো পেনাল্টি। গোলবার থেকে মাত্র ১২ গজ দূরে দাঁড়িয়ে থাকেন একজন খেলোয়াড়, সামনে শুধু একজন গোলরক্ষক। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে অধিকাংশ পেনাল্টিই গোলে পরিণত হয়। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে এই ১২ গজের দূরত্বই অনেক সময় হয়ে ওঠে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।

বিশ্বকাপ শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়; এটি কোটি মানুষের আবেগ, একটি দেশের স্বপ্ন এবং অনেক খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। তাই এখানকার একটি পেনাল্টি মিস শুধু একটি শট ব্যর্থ হওয়া নয়, অনেক সময় সেটিই বদলে দেয় পুরো ম্যাচের ইতিহাস, এমনকি একজন কিংবদন্তির পরিচয়ও।

 

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বড় তারকারাও বিশ্বকাপে পেনাল্টি মিস করেছেন। দিয়েগো ম্যারাডোনা, জিকো, মিশেল প্লাতিনি, রবার্তো বাজ্জিও, স্টুয়ার্ট পিয়ার্স-তালিকাটি দীর্ঘ। কারও মিসের পরও দল জিতেছে, আবার কারও একটি ভুলই শেষ করে দিয়েছে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন।

 

আজ থাকছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম দিকের সবচেয়ে স্মরণীয় কয়েকটি পেনাল্টি মিসের গল্প।

 

জিকো (ব্রাজিল, ১৯৮৬)

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও ফ্রান্স। অনেক ফুটবল বিশ্লেষকের মতে, বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ ছিল এটি। সেই সময়ের ব্রাজিল দলটিকে অনেকে সর্বকালের অন্যতম সেরা দল বলে মনে করেন। জিকো, সক্রেটিস, কারেকা, জুনিয়র, আলেমাও-তারকায় ঠাসা সেই দলকে বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার ধরা হচ্ছিল।

 

অন্যদিকে ফ্রান্সের নেতৃত্বে ছিলেন ইউরোপের সেরা ফুটবলার মিশেল প্লাতিনি। কারেকার গোলে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। পরে প্লাতিনির গোলে সমতায় ফেরে ফ্রান্স। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন জিকো। মাঠে নেমেই ব্রাজিলের আক্রমণে গতি আনেন তিনি। এরপর আসে ম্যাচের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত।

 

ফ্রান্সের ডিফেন্ডার জোয়েল বাতস জিকোকে ফাউল করলে ব্রাজিল পায় পেনাল্টি। পুরো স্টেডিয়াম নিশ্চিত ছিল, জিকো গোল করবেন। কিন্তু জোয়েল বাতস অসাধারণ দক্ষতায় জিকোর শট ঠেকিয়ে দেন। যদি সেই পেনাল্টি গোল হতো, তাহলে হয়তো ম্যাচটি টাইব্রেকার পর্যন্তই গড়াত না।

 

শেষ পর্যন্ত ম্যাচ ১-১ সমতায় থেকে টাইব্রেকারে যায়।

 

সক্রেটিসের ব্যর্থতা

টাইব্রেকারেও ব্রাজিলের শুরুটা ছিল হতাশাজনক। প্রথম শট নিতে এসে সক্রেটিসের দুর্বল প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দেন জোয়েল বাতস। অন্যদিকে ফ্রান্সের মিশেল প্লাতিনিও নিজের পেনাল্টি বাইরে মেরে বসেন। তবু শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের জুলিও সিজারের মিস ফ্রান্সকে সেমিফাইনালে পৌঁছে দেয়।

 

এই ম্যাচটি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা কোয়ার্টার ফাইনাল হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

মিশেল প্লাতিনি (ফ্রান্স, ১৯৮৬)

প্লাতিনির নাম শুনলেই অনেকের মনে পড়ে তার দুর্দান্ত ফ্রি-কিক কিংবা মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণের কথা। কিন্তু ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে টাইব্রেকারে তিনি নিজের পেনাল্টি বাইরে মেরে বসেছিলেন। সৌভাগ্যবশত ব্রাজিলের সক্রেটিস ও জুলিও সিজারও মিস করেন। ফলে প্লাতিনির সেই ভুল বড় ক্ষতির কারণ হয়নি। পরবর্তীতে ফ্রান্স সেমিফাইনালে ওঠে।

 

দিয়েগো ম্যারাডোনা (আর্জেন্টিনা, ১৯৯০)

১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেলতে নামে আর্জেন্টিনা। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে দলটি ছিল অনেকটাই রক্ষণাত্মক। কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল যুগোস্লাভিয়া। ১২০ মিনিটে কোনো দলই গোল করতে পারেনি। ফলে ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। আর্জেন্টিনার প্রথম শটগুলোর একটি নিতে আসেন দিয়েগো ম্যারাডোনা।

 

পুরো স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ। কিন্তু যুগোস্লাভ গোলরক্ষক তোমিস্লাভ ইভকোভিচ ম্যারাডোনার শট ঠেকিয়ে দেন। বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়ের এমন ব্যর্থতায় মুহূর্তের জন্য হতবাক হয়ে যায় আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা। তবে ম্যারাডোনার ভাগ্য ভালো ছিল।

 

যুগোস্লাভিয়ার দুই খেলোয়াড় ব্রাঙ্কো ব্রনোভিচ ও ফারুক হাদজিবেগিচ নিজেদের শট মিস করেন। অন্যদিকে গোলরক্ষক সের্হিও গোইকোচেয়া দুর্দান্ত দুটি সেভ করে আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালে তুলে দেন। আজও অনেকেই বলেন, যদি গোইকোচেয়া না থাকতেন, তাহলে ম্যারাডোনার সেই মিসই হয়তো আর্জেন্টিনার বিদায়ের কারণ হতো।

 

স্টুয়ার্ট পিয়ার্স ও ক্রিস ওয়াডল (ইংল্যান্ড, ১৯৯০)

১৯৯০ সালের বিশ্বকাপই ইংল্যান্ডের পেনাল্টি-দুঃস্বপ্নের শুরু। সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ১-১ সমতায় শেষ হয় ম্যাচ। টাইব্রেকারে প্রথম বড় ধাক্কা আসে স্টুয়ার্ট পিয়ার্সের শট রুখে দেন জার্মান গোলরক্ষক বোডো ইলগনার। এরপর ইংল্যান্ডের শেষ ভরসা ছিলেন ক্রিস ওয়াডল। গোল করলেই লড়াই টিকে থাকত। কিন্তু ওয়াডল বলটি অনেক ওপর দিয়ে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে পাঠিয়ে দেন।

 

ম্যাচ শেষে মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েন স্টুয়ার্ট পিয়ার্স। পরবর্তীতে ইংল্যান্ডে এই ম্যাচকে বলা হয় "The Beginning of England's Penalty Curse"।

 

ফ্রাঙ্কো বারেসি (ইতালি, ১৯৯৪)

১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের ফাইনাল ছিল ইতিহাসের প্রথম গোলশূন্য বিশ্বকাপ ফাইনাল। ব্রাজিল ও ইতালি-দুই দলই ১২০ মিনিটে গোল করতে পারেনি। ফলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালের নিষ্পত্তি হয় টাইব্রেকারে। ইতালির অধিনায়ক ফ্রাঙ্কো বারেসি পুরো ম্যাচে দুর্দান্ত খেললেও টাইব্রেকারের প্রথম শটটি অনেক ওপর দিয়ে বাইরে মেরে বসেন। এর ফলে শুরুতেই চাপে পড়ে ইতালি।

 

রবার্তো বাজ্জিও (ইতালি, ১৯৯৪)

বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় পেনাল্টি মিসের কথা উঠলে সবার আগে আসে একটি নাম-রবার্তো বাজ্জিও। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ইতালিকে প্রায় একাই ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। গ্রুপপর্বে ইতালি ছিল বিদায়ের মুখে। এরপর নকআউট পর্বে নাইজেরিয়া, স্পেন ও বুলগেরিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে দলকে ফাইনালে তোলেন বাজ্জিও। তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্সই ইতালির শিরোপা স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছিল।

 

ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে গোলশূন্য ১২০ মিনিটের পর টাইব্রেকারে প্রথমে বারেসি এবং পরে দানিয়েলে মাসারো পেনাল্টি মিস করেন।

 

সবশেষ শট নিতে আসেন বাজ্জিও।

 

সমীকরণ ছিল কঠিন-গোল করলেও ইতালির আশা পুরোপুরি বাঁচত না, কারণ এরপরও ব্রাজিলের শেষ শট মিস করার অপেক্ষায় থাকতে হতো। কিন্তু বাজ্জিওর শট গোলবারের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়। সেই মুহূর্তেই ব্রাজিল চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয়। আজও বাজ্জিওর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকার সেই ছবিটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতীকী মুহূর্তগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।


জেরার্ড-ল্যাম্পার্ড থেকে আসামোয়া গিয়ান-বিশ্বকাপে হৃদয়ভাঙা সব পেনাল্টি মিস

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন অনেক পেনাল্টি মিস রয়েছে, যেগুলো শুধু একটি ম্যাচের ফল বদলায়নি; বদলে দিয়েছে একটি দেশের ফুটবল ইতিহাসও। ১৯৯৪ সালের রবার্তো বাজ্জিওর মিসের পর বিশ্ব ফুটবল আরও অনেক নাটকীয় মুহূর্ত দেখেছে। ২০০৬ থেকে ২০১৮-এই সময়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে পেনাল্টি মিসের কয়েকটি ঘটনা আজও ফুটবলপ্রেমীদের মনে দাগ কেটে আছে।

 

কেউ হয়েছেন ট্র্যাজিক নায়ক, কেউ হয়েছেন সমালোচনার শিকার। আবার কারও মিস আজও পুরো একটি জাতির সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি হয়ে আছে।

 

জেরার্ড ও ল্যাম্পার্ড (ইংল্যান্ড, ২০০৬)

২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের দলটিকে অনেকেই দেশটির অন্যতম সেরা প্রজন্ম হিসেবে বিবেচনা করেন। দলে ছিলেন ডেভিড বেকহ্যাম, স্টিভেন জেরার্ড, ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড, ওয়েইন রুনি, জন টেরি, রিও ফার্দিনান্দ, অ্যাশলি কোল ও জো কোলের মতো তারকা। কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল লুইস ফেলিপে স্কোলারির পর্তুগাল।

 

রুনির লাল কার্ডে ১০ জনের দলে পরিণত হলেও ইংল্যান্ড ১২০ মিনিট পর্যন্ত গোল খায়নি। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় গোলশূন্য থাকার পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।

 

প্রথম বড় ধাক্কা আসে ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের পেনাল্টি মিসে। এরপর স্টিভেন জেরার্ডের শটও ঠেকিয়ে দেন পর্তুগালের গোলরক্ষক রিকার্দো। সবশেষে জেমি ক্যারাঘারের গোল বাতিল হওয়ার পর রিকার্দো আবারও সেভ করেন।

 

৪-১ ব্যবধানে টাইব্রেকারে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে পর্তুগাল। ইংল্যান্ডের তথাকথিত ‘গোল্ডেন জেনারেশন’-এর সবচেয়ে বড় আক্ষেপগুলোর একটি হয়ে আছে এই ম্যাচ।

 

ডেভিড ত্রেজেগে (ফ্রান্স, ২০০৬)

২০০৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ফাইনাল বলা হয়। ফাইনালের শুরুতেই আন্দ্রেয়া পিরলোর পাস থেকে ফাউল আদায় করেন ফ্লোরাঁ মালুদা। পেনাল্টি থেকে গোল করেন জিনেদিন জিদান। কিছুক্ষণ পরই মার্কো মাতেরাজ্জির হেডে সমতায় ফেরে ইতালি।

 

অতিরিক্ত সময়ে ঘটে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে আঘাত করায় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন জিদান। এটাই ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। ফলে ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।

 

ফ্রান্সের হয়ে দ্বিতীয় পেনাল্টি নিতে আসেন ডেভিড ত্রেজেগে। জুভেন্টাসের হয়ে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ গোল করা এই স্ট্রাইকারের শট গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফনকে পরাস্ত করলেও বল ক্রসবারে লেগে বাইরে চলে আসে। এটাই ছিল টাইব্রেকারের একমাত্র মিস।

 

ইতালি তাদের বাকি পাঁচটি শটই সফলভাবে সম্পন্ন করে। ফলে চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় আজ্জুরিরা। আজও অনেকেই বলেন, যদি ত্রেজেগের সেই বল কয়েক সেন্টিমিটার নিচে নামত, তাহলে হয়তো ইতিহাসটাই বদলে যেত।

 

আসামোয়া গিয়ান (ঘানা, ২০১০)

বিশ্বকাপের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক পেনাল্টি মিসের তালিকায় আসামোয়া গিয়ানের নাম সবসময়ই থাকবে। ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের মুখোমুখি হয়েছিল ঘানা। আফ্রিকার কোনো দেশ কখনো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠেনি। ঘানা সেই ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল।

 

১-১ সমতায় থাকা ম্যাচের ১২০তম মিনিটে গোললাইন থেকে লুইস সুয়ারেজ হাত দিয়ে নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দেন। রেফারি সঙ্গে সঙ্গে লাল কার্ড দেখান সুয়ারেজকে এবং ঘানাকে পেনাল্টি দেন। পুরো আফ্রিকা তখন অপেক্ষা করছে একটি শটের।সেই দায়িত্ব নেন আসামোয়া গিয়ান। গিয়ান তখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে নেওয়া টানা সব পেনাল্টিতে সফল ছিলেন। কিন্তু তাঁর শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে।

 

স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে যায়। সুয়ারেজ মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে উল্লাস করতে থাকেন। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে গিয়ান নিজের শটটি গোল করলেও জন মেনসাহ ও ডমিনিক আদিয়াহ মিস করেন। উরুগুয়ে জিতে যায়। সেমিফাইনালে ওঠার আফ্রিকার প্রথম সুযোগটিও হাতছাড়া হয়। অনেক ফুটবল ইতিহাসবিদ এখনও এটিকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক পেনাল্টি মিস হিসেবে বিবেচনা করেন।

 

লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা, ২০১৮)

২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে শুরু থেকেই চাপে ছিল আর্জেন্টিনা। গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে প্রতিপক্ষ ছিল বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নেওয়া আইসল্যান্ড। সের্হিও আগুয়েরোর গোলে এগিয়ে গেলেও দ্রুত সমতায় ফেরে আইসল্যান্ড। পরে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির সামনে সুযোগ ছিল দলকে আবার এগিয়ে নেওয়ার। কিন্তু আইসল্যান্ডের গোলরক্ষক হানেস হালদোরসন ডানদিকে ঝাঁপিয়ে শটটি ঠেকিয়ে দেন।

 

ম্যাচটি ১-১ গোলে শেষ হয়।

 

এই ড্রয়ের কারণে গ্রুপপর্বেই বড় চাপে পড়ে যায় আর্জেন্টিনা। পরে ক্রোয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে হেরে বিদায়ের শঙ্কায় পড়ে দলটি। শেষ ম্যাচে নাইজেরিয়াকে হারিয়ে কোনোমতে নকআউট পর্বে উঠলেও শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নেয়। বিশ্লেষকদের মতে, আইসল্যান্ড ম্যাচে সেই পেনাল্টি গোল হলে আর্জেন্টিনার পুরো গ্রুপপর্বের চিত্রই বদলে যেতে পারত।

 

ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল, ২০১৮)

২০১৮ বিশ্বকাপের শুরুটা ছিল ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর জন্য স্বপ্নের মতো। প্রথম ম্যাচেই স্পেনের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক। দ্বিতীয় ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে জয়সূচক গোল। শেষ ম্যাচে প্রতিপক্ষ ইরান। রিকার্দো কুয়ারেজমার গোলে এগিয়ে ছিল পর্তুগাল।দ্বিতীয়ার্ধে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (VAR) সহায়তায় পেনাল্টি পায় পর্তুগাল। রোনালদোর সামনে সুযোগ ছিল ব্যবধান ২-০ করার। কিন্তু ইরানের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দ ডানদিকে ঝাঁপিয়ে শটটি রুখে দেন। এরপর অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করে ইরান ১-১ সমতা ফেরায়।

 

শেষ মুহূর্তে মেহদি তারেমির শট অল্পের জন্য বাইরে না গেলে পর্তুগাল গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নিতে পারত। রোনালদোর সেই মিস তাই আরও আলোচনায় চলে আসে। 

 

পেনাল্টির মানসিক যুদ্ধ 

 

বিশ্বমানের ফুটবলারদের জন্যও বিশ্বকাপে পেনাল্টি নেওয়া সহজ নয়। কারণ এটি শুধু গোলরক্ষক ও শ্যুটারের লড়াই নয়, বরং মানসিক শক্তিরও পরীক্ষা। গোলরক্ষকেরা শট নেওয়ার আগে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করেন-কখনও শট নিতে দেরি করান, কখনও শ্যুটারের সঙ্গে কথা বলেন, কখনও বলের অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করেন।

 

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বকাপের মতো আসরে লাখো দর্শক ও কোটি মানুষের প্রত্যাশা একজন খেলোয়াড়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এ কারণেই ক্লাব ফুটবলে নিয়মিত পেনাল্টি থেকে গোল করা অনেক খেলোয়াড়ও বিশ্বকাপে এসে ভুল করেন।

 

বিশ্বকাপের ইতিহাস প্রমাণ করে, ১২ গজের এই দূরত্ব কখনও কখনও একজন কিংবদন্তির জন্যও সবচেয়ে দীর্ঘ পথ হয়ে ওঠে।

 

হ্যারি কেইন থেকে বুসকেটস-কাতার বিশ্বকাপের ১২ গজের বেদনা

বিশ্বকাপের ইতিহাসে কাতার ২০২২ আসরকে অনেকেই সর্বকালের অন্যতম সেরা টুর্নামেন্ট বলে মনে করেন। গোল, নাটকীয়তা, অঘটন, টাইব্রেকার-সব মিলিয়ে এটি ছিল আবেগে ভরা একটি বিশ্বকাপ। তবে এই আসরটি আরও একটি কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে-একাধিক বিশ্বমানের ফুটবলারের পেনাল্টি ব্যর্থতা।

 

কেউ ম্যাচ চলাকালীন পেনাল্টি মিস করেছেন, কেউ আবার টাইব্রেকারে। কারও ভুলে বিদায় নিতে হয়েছে পুরো দলকে, আবার কারও ব্যর্থতা আজও সমর্থকদের মনে বেদনার স্মৃতি হয়ে আছে।

 

রবার্ট লেভানডোভস্কি (পোল্যান্ড, ২০২২)

বিশ্বকাপে রবার্ট লেভানডোভস্কির ক্যারিয়ারের শুরুটা মোটেও সুখকর ছিল না। ২০১৮ বিশ্বকাপে গোলশূন্য ছিলেন তিনি। তাই কাতারে এসে সব আলো ছিল পোল্যান্ড অধিনায়কের দিকে। প্রথম ম্যাচে প্রতিপক্ষ মেক্সিকো। ৬০ মিনিটের দিকে পেনাল্টি পায় পোল্যান্ড।

 

লেভানডোভস্কির সামনে সুযোগ ছিল নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল করার। কিন্তু মেক্সিকোর কিংবদন্তি গোলরক্ষক গুইয়ের্মো ওচোয়া অসাধারণ দক্ষতায় তাঁর শট রুখে দেন।

 

ম্যাচটি শেষ হয় ০-০ গোলে।

যদিও পরে সৌদি আরবের বিপক্ষে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল করেন লেভানডোভস্কি, তবুও মেক্সিকো ম্যাচের সেই মিস আজও আলোচিত। বিশেষ করে ওচোয়ার অসাধারণ গোলকিপিং আবারও প্রমাণ করে কেন তাঁকে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকদের একজন বলা হয়।

 

হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড, ২০২২)

কাতার বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় পেনাল্টি মিসের নাম হ্যারি কেইন। কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। ২২ মিনিটে অরেলিয়েন চুয়ামেনির গোলে এগিয়ে যায় ফ্রান্স। দ্বিতীয়ার্ধে পেনাল্টি থেকে গোল করে সমতা ফেরান কেইন। এরপর অলিভিয়ে জিরুর গোলে আবারও এগিয়ে যায় ফ্রান্স। ৮৪ মিনিটে দ্বিতীয়বার পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড। 

 

আবারও বলের পেছনে দাঁড়ান কেইন। সামনে তাঁর দীর্ঘদিনের টটেনহাম সতীর্থ এবং বন্ধু হুগো লরিস। প্রথমবার লরিসকে পরাস্ত করলেও দ্বিতীয়বার পারেননি। চাপের মুহূর্তে তাঁর শট অনেক ওপরে উড়ে যায়।

 

ম্যাচ শেষ হয় ২-১ ব্যবধানে।

ফ্রান্স উঠে যায় সেমিফাইনালে। পরে কেইন স্বীকার করেছিলেন, সেই পেনাল্টি মিসের হতাশা কাটিয়ে উঠতে তাঁর দীর্ঘ সময় লেগেছিল।

 

কিংসলে কোমান (ফ্রান্স, ২০২২)

১৮ ডিসেম্বর, ২০২২। লুসাইল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফাইনাল। আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও এমবাপ্পের দুর্দান্ত জোড়া গোলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়েও দুই দল গোল করলে ৩-৩ সমতায় শেষ হয় ১২০ মিনিট। ফলে শিরোপার ভাগ্য নির্ধারণে প্রয়োজন হয় টাইব্রেকারের। ফ্রান্সের হয়ে দ্বিতীয় শট নিতে আসেন কিংসলে কোমান।

 

আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ তাঁর শট ডানদিকে ঝাঁপিয়ে ঠেকিয়ে দেন। টাইব্রেকারের মোড় সেখানেই ঘুরে যায়। পরে ম্যাচ শেষে কোমান কান্নায় ভেঙে পড়েন।

 

অরেলিয়েন চুয়ামেনি (ফ্রান্স, ২০২২)

কোমানের সেভের পর ফ্রান্সের সামনে আর ভুল করার সুযোগ ছিল না। চাপ নিয়ে বলের পেছনে দাঁড়ান তরুণ মিডফিল্ডার অরেলিয়েন চুয়ামেনি। কিন্তু এর আগেই শুরু হয়ে যায় মানসিক যুদ্ধ। এমিলিয়ানো মার্টিনেজ বলটি তুলে দূরে ছুড়ে দেন।চুয়ামেনিকে অপেক্ষা করান। রেফারি আবার বল এনে দেন। এই সময় গ্যালারিতে হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থকের শোরগোল। চাপ সামলাতে পারেননি চুয়ামেনি। তাঁর শট গোলপোস্টের বাম পাশ দিয়ে বাইরে চলে যায়।

 

পরবর্তীতে বহু বিশ্লেষক বলেন, মার্টিনেজের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল এই টাইব্রেকারে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

 

রদ্রিগো (ব্রাজিল, ২০২২)

কাতার বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় অঘটনের একটি ঘটেছিল ব্রাজিল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে। অতিরিক্ত সময়ে নেইমারের অসাধারণ গোলে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। মনে হচ্ছিল সেমিফাইনাল নিশ্চিত। কিন্তু ১১৭ মিনিটে ব্রুনো পেতকোভিচের শটে সমতা ফেরায় ক্রোয়েশিয়া। টাইব্রেকারে প্রথম শট নিতে আসেন তরুণ রদ্রিগো। গোলরক্ষক ডমিনিক লিভাকোভিচ তাঁর শট সহজেই আটকে দেন। পরে মারকিনিয়োসের শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে বিদায় নেয় ব্রাজিল।

 

অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, প্রথম পেনাল্টি নেওয়ার দায়িত্ব কেন অভিজ্ঞদের না দিয়ে তরুণ রদ্রিগোকে দেওয়া হয়েছিল।

 

সার্জিও বুসকেটস (স্পেন, ২০২২)

স্পেন পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে দারুণ ফুটবল খেললেও গোল করার ক্ষেত্রে ছিল ভীষণ অনিয়মিত। শেষ ষোলোতে প্রতিপক্ষ মরক্কো। ১২০ মিনিটেও গোল করতে পারেনি কোনো দল। টাইব্রেকারে স্পেনের শুরুটাই ছিল ভয়াবহ। পাবলো সারাবিয়া পোস্টে মারেন। কার্লোস সোলেরের শট ঠেকিয়ে দেন ইয়াসিন বুনু। এরপর অধিনায়ক সার্জিও বুসকেটসের ওপর ভরসা করেছিল স্পেন।

 

কিন্তু তাঁর শটও দুর্দান্তভাবে রুখে দেন বুনু।

 

অবিশ্বাস্যভাবে একটি পেনাল্টিও গোল করতে পারেনি স্পেন। অন্যদিকে মরক্কো ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। এই ম্যাচের পর বুনুকে অনেকেই মরক্কোর সর্বকালের সেরা গোলরক্ষক বলতে শুরু করেন।

 

বিশ্বকাপে গোলরক্ষকদের উত্থান

কাতার বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে, আধুনিক ফুটবলে পেনাল্টি শুধু শ্যুটারের দক্ষতার বিষয় নয়। এটি গোলরক্ষকদেরও একটি বিশেষ দক্ষতার জায়গা। ইয়াসিন বুনু, ডমিনিক লিভাকোভিচ, এমিলিয়ানো মার্টিনেজ এবং গুইয়ের্মো ওচোয়া-চারজনই নিজেদের অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে দেখিয়েছেন, সঠিক প্রস্তুতি ও মানসিক দৃঢ়তা থাকলে বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকারদেরও থামানো সম্ভব।

 

বর্তমানে প্রায় সব জাতীয় দলই প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের পেনাল্টির ভিডিও বিশ্লেষণ করে। কোন খেলোয়াড় কোন দিকে বেশি শট নেন, চাপের মুহূর্তে তাঁর সিদ্ধান্ত কেমন হয়-এসব তথ্য এখন গোলরক্ষকদের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে তাই পেনাল্টি আর কেবল ভাগ্যের বিষয় নয়; এটি পরিণত হয়েছে কৌশল, তথ্য বিশ্লেষণ এবং মানসিক শক্তির এক অনন্য লড়াইয়ে।


মেসি থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপ-১২ গজের দূরত্বে লেখা হয় ইতিহাস, আবার ভেঙেও যায় স্বপ্ন

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অসংখ্য কিংবদন্তি ফুটবলার পেনাল্টি থেকে গোল করেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, একই মঞ্চে অনেক কিংবদন্তির ক্যারিয়ারে এমন মুহূর্তও এসেছে, যখন মাত্র ১২ গজের দূরত্বটাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।

 

লিওনেল মেসি, ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো, রবার্তো বাজ্জিও কিংবা হ্যারি কেইন-সবাই কোনো না কোনো সময় বিশ্বকাপে পেনাল্টি মিস করেছেন। কিন্তু তাঁদের কেউই সেই ব্যর্থতার কাছে হার মানেননি। বরং অনেকেই পরবর্তীতে সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে ইতিহাস গড়েছেন।

 

লিওনেল মেসি (২০১৮–২০২২)

বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির পেনাল্টি ইতিহাস একেবারেই বৈচিত্র্যময়। 

২০১৮: আইসল্যান্ডের বিপক্ষে হতাশা 

 

রাশিয়া বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই আইসল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। সামনে ছিলেন গোলরক্ষক হানেস হালদোরসন।মেসির নেওয়া নিচু শট ডানদিকে ঝাঁপিয়ে রুখে দেন আইসল্যান্ডের গোলরক্ষক। ম্যাচটি ১-১ গোলে শেষ হয়। সেই ড্রয়ের কারণেই আর্জেন্টিনা গ্রুপপর্বে বড় চাপে পড়ে যায়।

 

২০২২: পোল্যান্ড ম্যাচেও ব্যর্থ 

 

কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে পোল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি পান মেসি। কিন্তু এবার বাধা হয়ে দাঁড়ান ভইচেখ শেজনি। VAR-এর মাধ্যমে পাওয়া সেই পেনাল্টি দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন পোল্যান্ডের গোলরক্ষক। তবে সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ২-০ ব্যবধানে জিতে যায়। অর্থাৎ পেনাল্টি মিস করলেও দলের জয় থেমে থাকেনি।

 

এরপরও ইতিহাসের শীর্ষে

মজার বিষয় হলো, বিশ্বকাপে পেনাল্টি মিস করলেও মেসির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারকে সেটি সংজ্ঞায়িত করেনি।

বরং-

  • ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জেতেন।
  • টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন।
  • বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়েন।
  • নকআউট পর্বে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জেতা অধিনায়কদের একজন হন।
  • বিশ্বকাপে গোল ও অ্যাসিস্ট-দুই বিভাগেই সর্বকালের সেরাদের কাতারে জায়গা করে নেন।

অর্থাৎ বিশ্বকাপের ইতিহাস প্রমাণ করেছে, একটি পেনাল্টি মিস কখনোই একজন কিংবদন্তির পরিচয় নির্ধারণ করে না।

 

২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন অধ্যায় (চলমান টুর্নামেন্ট)

(এই অংশটি চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপের ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তিতে প্রস্তুত। এটি অতীত ইতিহাসের অংশ নয়।)

 

২০২৬ বিশ্বকাপেও পেনাল্টি নাটক শুরু হয়ে গেছে।

 

গ্রুপপর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে লিওনেল মেসি পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি। তবে শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ২-০ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় এবং মেসিই ম্যাচের বাকি দুই গোল করে দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অন্যদিকে নকআউট পর্বে জার্মানি ও প্যারাগুয়ের ম্যাচটি গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে কাই হাভার্টজ, নিক ভল্টেমাডে ও জোনাথন টাহ পেনাল্টি মিস করলে বিদায় নিতে হয় চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে।

 

২০২৬ আসরের এই ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং আধুনিক প্রস্তুতি যতই উন্নত হোক, বিশ্বকাপের পেনাল্টি এখনও সবচেয়ে বড় মানসিক পরীক্ষাগুলোর একটি।

 

পেনাল্টি শুটআউট কেন এত কঠিন?

বিশ্বকাপে পেনাল্টি নেওয়ার সময় খেলোয়াড়কে শুধু গোলরক্ষকের বিপক্ষে নয়, লড়তে হয় নিজের সঙ্গেও। খেলাধুলার মনোবিজ্ঞানীদের মতে, স্বাভাবিক সময়ে একজন ফুটবলারের হৃদস্পন্দন যেখানে মিনিটে ১২০–১৪০ বার থাকে, পেনাল্টি নেওয়ার মুহূর্তে তা ১৮০–১৯০ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। এই অতিরিক্ত চাপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শরীরের ভারসাম্য এবং শটের নির্ভুলতায় প্রভাব ফেলে।

 

আধুনিক ফুটবলে গোলরক্ষকেরাও বিশেষভাবে প্রস্তুতি নেন। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের আগের শত শত পেনাল্টির ভিডিও বিশ্লেষণ করা হয়। কে কোন দিকে বেশি শট নেন, কোন পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নেন-এসব তথ্য আগেই সংগ্রহ করে রাখা হয়।এ কারণেই বর্তমানে বিশ্বকাপের পেনাল্টি শুটআট আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলনির্ভর।

 

বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় পেনাল্টি মিস

বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত পেনাল্টি মিসগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • জিকো (১৯৮৬) - ম্যাচ চলাকালীন ফ্রান্সের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস।
  • সক্রেটিস (১৯৮৬) - টাইব্রেকারে ব্যর্থ।
  • মিশেল প্লাতিনি (১৯৮৬) - টাইব্রেকারে মিস করেও ফ্রান্স জেতে।
  • দিয়েগো ম্যারাডোনা (১৯৯০) - যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে মিস।
  • স্টুয়ার্ট পিয়ার্স ও ক্রিস ওয়াডল (১৯৯০) - ইংল্যান্ডের পেনাল্টি অভিশাপের সূচনা।
  • ফ্রাঙ্কো বারেসি (১৯৯৪) - ফাইনালে প্রথম শটই বাইরে।
  • রবার্তো বাজ্জিও (১৯৯৪) - বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত পেনাল্টি মিস।
  • স্টিভেন জেরার্ড ও ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড (২০০৬) - পর্তুগালের বিপক্ষে টাইব্রেকারে ব্যর্থ।
  • ডেভিড ত্রেজেগে (২০০৬) - ফাইনালে ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে শট।
  • আসামোয়া গিয়ান (২০১০) - আফ্রিকার ইতিহাস বদলে দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া।
  • ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো (২০১৮) - ইরানের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস।
  • লিওনেল মেসি (২০১৮ ও ২০২২) - দুটি বিশ্বকাপেই ম্যাচ চলাকালীন পেনাল্টি মিস।
  • হ্যারি কেইন (২০২২) - ফ্রান্সের বিপক্ষে সমতার সুযোগ নষ্ট।
  • কিংসলে কোমান ও অরেলিয়েন চুয়ামেনি (২০২২) - ফাইনালের টাইব্রেকারে ব্যর্থ।
  • রদ্রিগো (২০২২) - ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারের প্রথম শটেই ব্যর্থ।
  • সার্জিও বুসকেটস (২০২২) - মরক্কোর বিপক্ষে স্পেনের বিদায় নিশ্চিত হয় তাঁর মিসে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সুন্দর গোলগুলোর মতোই সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলোর বড় একটি অংশ জুড়ে আছে পেনাল্টি মিস। কারণ, এখানে একজন খেলোয়াড়ের সামনে থাকে শুধু গোলরক্ষক, কিন্তু তাঁর কাঁধে থাকে কোটি মানুষের প্রত্যাশা।

 

রবার্তো বাজ্জিও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন, আসামোয়া গিয়ান হতাশ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন, হ্যারি কেইন দুই হাতে মুখ ঢেকে রেখেছেন কিংবা কোমান-চুয়ামেনির চোখে অশ্রু-এসব দৃশ্য বিশ্বকাপের ইতিহাস থেকে কখনো মুছে যাবে না।

 

তবু ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই। কারণ, একটি পেনাল্টি মিস একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারকে থামিয়ে দিতে পারে না। বরং অনেক সময় সেই ব্যর্থতাই তাঁকে আরও বড় কিংবদন্তিতে পরিণত করে।

 

বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরই নতুন নায়ক জন্ম দেয়, আবার নতুন ট্র্যাজিক চরিত্রও তৈরি করে। আর তাই ১২ গজের এই ছোট্ট দূরত্বটি কখনো হয়ে ওঠে উল্লাসের, কখনো কান্নার, আবার কখনো পুরো ফুটবল ইতিহাস বদলে দেওয়া এক অবিস্মরণীয় মুহূর্তের প্রতীক।


সম্পর্কিত নিউজ