{{ news.section.title }}
কেপ ভার্দে দেখিয়ে দিল আর্জেন্টিনার দুর্বলতা?
মনে আছে সৌদি আরবের কথা! ২০২২ সালের ২২ নভেম্বর লুসাইল স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন ঘটিয়েছিল তারা। পিছিয়ে পড়েও আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল। পরের দৃশ্য ভিন্ন। একে একে সব বাধা ডিঙিয়ে যায় আলবিসেলেস্তেরা। ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেই লুসাইলেই ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতে তারা। লিওনেল মেসি হাতে তোলেন ক্যারিয়ারের কাঙ্ক্ষিত ট্রফি।
প্রায় সাড়ে তিন বছর পর আবার কেন সৌদি আরবের প্রসঙ্গ? কারণ ফুটবল ইতিহাস বলছে, কখনও কখনও একটি কঠিন ধাক্কাই চ্যাম্পিয়নদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। ২০২২ সালে সৌদি আরব সেই ধাক্কা দিয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। এবার কি সেই ভূমিকায় কেপ ভার্দে?
শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে এবারের বিশ্বকাপে এসেছে আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানকে হারিয়ে কোনো ধরনের বড় পরীক্ষার মুখে না পড়েই শেষ ৩২ নিশ্চিত করে লিওনেল স্কালোনির দল। অনেকের ধারণা ছিল, নকআউটের প্রথম ম্যাচেও খুব একটা সমস্যা হবে না। প্রতিপক্ষ তো প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা কেপ ভার্দে।
কিন্তু কাগজে-কলমের হিসাব আর মাঠের বাস্তবতা এক নয়-সেটাই আবারও প্রমাণ করল ছোট্ট আফ্রিকান দেশটি।
স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের মতো দলকে গ্রুপ পর্বে আটকে দেওয়া কেপ ভার্দে নিজেদের আত্মবিশ্বাস নিয়েই নেমেছিল। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সামনে কোনো ভয় ছিল না। বরং ম্যাচ যত এগিয়েছে, ততই পরিষ্কার হয়েছে-তারা শুধু প্রতিরোধ গড়তে আসেনি, ইতিহাসও লিখতে চেয়েছিল।
আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে জিতেছে ঠিকই, কিন্তু জয়টি এসেছে অতিরিক্ত সময়ে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেড থেকে ডিনি বোর্গেসের আত্মঘাতী গোলে। অর্থাৎ ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়াতে আর মাত্র কয়েক মিনিট দূরে ছিল।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা ছিল আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ। কেপ ভার্দে দুইবার সমতায় ফিরেছে। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণও বহু সময় ধরে নিজেদের দখলে রেখেছিল। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের নিয়মিত প্রেসিং ভেঙে বারবার আক্রমণে উঠেছে তারা। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম অংশগ্রহণেই এমন সাহসী ফুটবল অনেক বিশ্লেষককেই বিস্মিত করেছে।
ম্যাচের আগেই স্কালোনি সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কেপ ভার্দে এমন একটি দল, যারা স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবকে আটকে দিয়েছে। তাদের হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ম্যাচ শেষে তাঁর সেই সতর্কবার্তার সত্যতা আরও পরিষ্কার হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Reuters এই ম্যাচকে আর্জেন্টিনার জন্য একটি "wake-up call" বা জাগিয়ে দেওয়ার মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রুপ পর্বে খুব বেশি চাপে না পড়া আর্জেন্টিনা প্রথমবার এমন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হলো, যারা তাদের পরিকল্পনাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে।
ম্যাচ শেষে লিওনেল মেসিও সন্তুষ্ট ছিলেন না। বিশ্বকাপে নিজের ২০তম গোল করা এই অধিনায়ক স্বীকার করেন, দল অনেক জায়গাতেই প্রত্যাশামতো খেলতে পারেনি।
মেসির ভাষায়, "অনেক খারাপ দিক ছিল। ওদের পায়ে বল ছিল এবং ওরা আমাদের প্রচুর দৌড় করিয়েছে। আমরা ঠিকভাবে প্রেসিং করতে পারিনি। রক্ষণ ও আক্রমণের লাইনের মধ্যে দূরত্ব অনেক বেশি ছিল।"
স্কালোনিও একই সুরে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বকাপের নকআউটে সহজ ম্যাচ বলে কিছু নেই। তবে সবচেয়ে ইতিবাচক বিষয় হলো, কঠিন মুহূর্তেও দল হাল ছাড়েনি।
তিনি বলেন, "উন্নতির জায়গা সবসময় থাকে। আমরা ভালো খেলেছি না খারাপ খেলেছি, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু এই দল কখনো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা ছেড়ে দেয় না। কঠিন পরিস্থিতি থেকে ফিরে আসার মানসিকতা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।"
১৯৯৮ ও ২০০২ বিশ্বকাপে খেলা রিভার প্লেটের সাবেক কোচ মার্সেলো গালিয়ার্দোও এই ম্যাচকে ইতিবাচক ধাক্কা হিসেবে দেখছেন।
ইএসপিএন আর্জেন্টিনাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "যা ঘটেছে, সেটা খারাপ নয়। বরং এর একটি প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। আর সেই প্রতিক্রিয়াটাই প্রয়োজন ছিল।"
এই জয়ে বড় অবদান রেখেছেন ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা দুই ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। লিসান্দ্রো অতিরিক্ত সময়ে গোল করেন। আর রোমেরোর হেড থেকেই আসে জয়সূচক আত্মঘাতী গোল।
২০২৫ সালের শুরুতে এসিএল চোটে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকা লিসান্দ্রো ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, "সময়টা খুব কঠিন ছিল। তবে জাতীয় দল, ক্লাব, ডাক্তার ও কোচিং স্টাফ সবাই আমাকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছেন। আজ আমি সত্যিই খুব আনন্দিত।"
অন্যদিকে কেপ ভার্দে হারলেও বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার দেশটি প্রথম বিশ্বকাপেই স্পেন, উরুগুয়ে, সৌদি আরব ও পরে আর্জেন্টিনার মতো দলকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে। The Guardian লিখেছে, স্কোরবোর্ডে জয় আর্জেন্টিনার হলেও ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় জিতে নিয়েছে কেপ ভার্দে। AP বলছে, বিশ্বকাপে অভিষেকেই নিজেদের ফুটবল পরিচয় বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছে তারা।
এখন আর্জেন্টিনার সামনে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ মিসর। দল ইতোমধ্যে অনুশীলনে ফিরেছে। রক্ষণভাগের দুর্বলতা, প্রেসিংয়ের সমস্যা এবং মাঝমাঠের সমন্বয় নিয়ে কাজ শুরু করেছেন স্কালোনি।
২০২২ সালে সৌদি আরবের কাছে হারার পর বদলে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। এবার কেপ ভার্দে হারাতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আত্মতুষ্টিতে বড় আঘাত করেছে। সামনে আরও কঠিন প্রতিপক্ষ অপেক্ষা করছে। এখন দেখার বিষয়, সৌদি আরবের মতো কেপ ভার্দেও কি আর্জেন্টিনার ঘুম ভাঙিয়ে দিল, নাকি এই সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করেই এগোবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।