{{ news.section.title }}
আবারও কি বেঞ্চেই থাকবেন নেইমার?
নেইমার যেন এক মরীচিকা। দূর থেকে দেখা যায়, কাছে গেলে মিলিয়ে যান। খেলবেন কি খেলবেন না-এই প্রশ্নেই কেটে যাচ্ছে একের পর এক ম্যাচ। বিশ্বকাপে তাঁকে ঘিরে আলোচনা, কৌতূহল, প্রত্যাশা-সবই আছে। নেই শুধু মাঠে তাঁর উপস্থিতি। ব্রাজিল যখন নকআউট পর্বে একের পর এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছে, তখন দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা বসে আছেন ডাগআউটে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর আলোচনাতেও এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-নেইমার কি সত্যিই খেলবেন, নাকি তিনি থেকে যাবেন শুধু সম্ভাবনার নাম হয়ে?
আজ শেষ ষোলোর ম্যাচে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ ইউরোপের শক্তিশালী দল নরওয়ে। ম্যাচটি হওয়ার কথা ছিল ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বনাম আর্লিং হলান্ড কিংবা নেইমার বনাম হলান্ডের লড়াই হিসেবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ব্রাজিলের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু এখন ভিনিসিয়ুস, ম্যাথিউস কুনহা, গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি কিংবা রায়ানেরা। নেইমারের নাম আছে স্কোয়াডে, আলোচনায়ও আছে, কিন্তু মাঠে তাঁর উপস্থিতি এখনো অধরাই।
এই পরিস্থিতি নিয়ে ব্রাজিলজুড়ে আলোচনা আরও বেড়েছে, কারণ কার্লো আনচেলত্তি নিজেই জানিয়েছেন, নেইমার এখন পুরো ৯০ মিনিট খেলার মতো শারীরিকভাবে প্রস্তুত। তবে একই সঙ্গে তিনি এটাও পরিষ্কার করেছেন, ম্যাচের প্রয়োজন না হলে নেইমারকে মাঠে নামানোর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আনচেলত্তির ভাষায়, "সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সে এখন খেলতে পারে। কিন্তু কতক্ষণ খেলবে, সেটা কেউ আগে থেকে বলতে পারে না। যখন মনে হবে দলকে তার প্রয়োজন, তখনই আমি তাকে মাঠে নামাব।"
এই বক্তব্যই যেন নেইমারের বর্তমান অবস্থার সবচেয়ে বড় প্রতিচ্ছবি। তিনি ফিট, কিন্তু নিশ্চিত নন। প্রস্তুত, কিন্তু শুরুর একাদশে জায়গা নিশ্চিত নয়। ব্রাজিলের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবলার হয়েও বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তাঁর অবদান মাত্র ১৪ মিনিট।
প্রায় তিন বছর পর জাতীয় দলে ফিরে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন নেইমার। দীর্ঘ ৯৮১ দিন পর ব্রাজিলের জার্সিতে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে আবেগের কমতি ছিল না। ম্যাচ শেষে সন্তানকে কোলে নিয়ে কান্নার সেই ছবি বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল। অনেকের কাছে সেটিই ছিল এই বিশ্বকাপে নেইমারের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত। কিন্তু একজন ফুটবলারের কাছে কি সেটুকুই যথেষ্ট?
জাপানের বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচেও তাঁকে ঘিরে ছিল প্রবল প্রত্যাশা। ব্রাজিল পিছিয়ে পড়েছিল, পরে সমতায় ফিরেছিল, শেষ মুহূর্তে জয়ও পেয়েছিল। কিন্তু পুরো ম্যাচেই বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছে নেইমারকে। পরে আনচেলত্তি জানান, ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গেলে তাঁকে নামানোর পরিকল্পনা ছিল। যেহেতু নির্ধারিত সময়েই ব্রাজিল জয় নিশ্চিত করেছে, তাই সেই পরিকল্পনার আর প্রয়োজন হয়নি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Reuters-এর এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে আনচেলত্তি আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, নেইমারকে দলে রাখা কিংবা খেলানো কখনোই আবেগের সিদ্ধান্ত নয়। তাঁর নির্বাচন সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বর্তমান ফিটনেস, পারফরম্যান্স এবং দলের প্রয়োজনের ওপর। ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া কিংবা অতীতের সাফল্য এই সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলছে না।
তবে কোচের কথায় নেইমারের প্রতি আস্থার অভাব নেই। বরং তিনি জানিয়েছেন, বেঞ্চে বসে থাকলেও নেইমারের আচরণ ছিল নিখুঁত পেশাদার একজন ফুটবলারের মতো। আনচেলত্তি বলেন, "সে খুশি নয়, কারণ কোনো বড় ফুটবলারই বেঞ্চে বসে খুশি থাকে না। কিন্তু সে দারুণ অনুশীলন করছে, খুব ভদ্র, বিনয়ী এবং সতীর্থদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ।"
এদিকে The Guardian-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত ও ভারসাম্যপূর্ণ দল। এই নতুন কাঠামোয় ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ব্রুনো গিমারাইস, মার্তিনেল্লি ও কুনহার মতো খেলোয়াড়েরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ফলে নেইমারের মতো বড় তারকাকেও জায়গা করে নিতে হচ্ছে অপেক্ষার সারিতে।
বিশ্বকাপের আগে আলোচনায় ছিল চারটি নাম-লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং নেইমার। সময়ের সঙ্গে মেসি গোল করছেন, এমবাপ্পে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে আছেন, রোনালদো নেতৃত্ব দিচ্ছেন পর্তুগালকে। একমাত্র নেইমারই এখনো নিজের গল্প লিখতে পারেননি।
ব্রাজিল যদি বিশ্বকাপের ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছায়, সামনে আরও তিনটি ম্যাচ খেলার সুযোগ থাকবে। প্রতিটি ম্যাচের আগে একই প্রশ্ন উঠবে-আজ কি নেইমার খেলবেন? আর প্রতিটি ম্যাচেই হয়তো উত্তরটি নির্ভর করবে কার্লো আনচেলত্তির সিদ্ধান্তের ওপর। বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবলারদের একজন হয়েও নেইমারের বাস্তবতা এখন এমন-তিনি পুরোপুরি ফিট, কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ যেন কোনো ডিফেন্ডার নয়, বরং সময়, কৌশল এবং অপেক্ষা।