কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে পেল ফ্রান্স, ফিরছে ২০২২ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের স্মৃতি

কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে পেল ফ্রান্স, ফিরছে ২০২২ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের স্মৃতি
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর বাধা পেরিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ফ্রান্স ও মরক্কো। শেষ ষোলোর ম্যাচে প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করেছে বর্তমান ইউরোপীয় শক্তি ফ্রান্স। অন্যদিকে দাপুটে ফুটবল খেলেই কানাডাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটেছে মরক্কো। ফলে আগামী ৯ জুলাই ফুটবল বিশ্ব আবারও দেখতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ফ্রান্স-মরক্কো লড়াই।

দুই দলের এই ম্যাচটি কেবল কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াই নয়, বরং এটি ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের পুনরাবৃত্তি। চার বছর আগে সেই ম্যাচে ফ্রান্স ২-০ গোলে জিতে ফাইনালে উঠেছিল। তবে আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার ইতিহাস গড়ে সবার মন জয় করেছিল মরক্কো।

 

এমবাপ্পের গোলে শেষ আটে ফ্রান্স

প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি সহজ ছিল না ফ্রান্সের জন্য। গোটা ম্যাচজুড়েই শক্ত রক্ষণ গড়ে তোলে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। প্রথমার্ধে কয়েকটি ভালো সুযোগ পেলেও গোলের দেখা পাচ্ছিল না দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা।

 

শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয়ার্ধে কিলিয়ান এমবাপ্পের একটি দুর্দান্ত ফিনিশিং ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়। সেই একমাত্র গোলেই ১-০ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে ফ্রান্স। টুর্নামেন্টে এমবাপ্পের ধারাবাহিক গোল করার সক্ষমতা আবারও প্রমাণ করে কেন তাকে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর ফরোয়ার্ড বলা হয়।

 

শেষ ৩২-এ সুইডেনকে ৩-০ গোলে হারানোর পর প্যারাগুয়ের বিপক্ষেও রক্ষণ ও আক্রমণের ভারসাম্য ধরে রাখে ফ্রান্স। বিশেষ করে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ও বল দখলে ছিল তাদের স্পষ্ট আধিপত্য।

 

আরও পড়ুন: এমবাপ্পের এক গোলেই কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স

 

মরক্কোর দাপুটে জয়

অন্যদিকে মরক্কো কানাডার বিপক্ষে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। দ্রুত বল আদান-প্রদান, উইং ব্যবহার এবং দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকের মাধ্যমে কানাডার রক্ষণকে একাধিকবার চাপে ফেলে আফ্রিকার প্রতিনিধিরা।

 

প্রথমার্ধেই এগিয়ে যায় মরক্কো। বিরতির পর আরও দুটি গোল করে ম্যাচ পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে তারা। শেষ পর্যন্ত ৩-০ গোলের বড় জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করে ওয়ালিদ রেগরাগুইয়ের দল।

 

বিশ্বকাপে মরক্কোর এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স প্রমাণ করছে, ২০২২ সালের সাফল্য কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। বরং তারা এখন বিশ্বের অন্যতম সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ দল।

 

আবারও মুখোমুখি এমবাপ্পে ও হাকিমি

এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে যাচ্ছে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আশরাফ হাকিমির দ্বৈরথ।

 

দুজন শুধু প্রতিপক্ষ নন, ক্লাব ফুটবলেও দীর্ঘদিন সতীর্থ ছিলেন। মাঠের বাইরে তাদের বন্ধুত্ব ফুটবল বিশ্বে বহুল আলোচিত। কিন্তু জাতীয় দলের জার্সিতে নামলে সেই বন্ধুত্বের জায়গা নেয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

 

২০২২ সালের সেমিফাইনালেও এমবাপ্পেকে আটকানোর দায়িত্ব ছিল হাকিমির ওপর। এবারও সেই একই দৃশ্য দেখা যেতে পারে। ইউরোপের অন্যতম দ্রুতগতির ফরোয়ার্ডকে থামানোই হবে মরক্কোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

ইতিহাস কী বলছে?

ফ্রান্স ও মরক্কোর মধ্যকার আন্তর্জাতিক ম্যাচ খুব বেশি হয়নি। তবে গুরুত্বপূর্ণ আসরে দুই দলের সবচেয়ে স্মরণীয় লড়াই অবশ্যই ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল।

 

সেই ম্যাচে থিও হার্নান্দেজের দ্রুত গোল এবং পরে র‍্যান্ডাল কলো মুয়ানির গোল ফ্রান্সকে ২-০ ব্যবধানে জয় এনে দেয়। তবে স্কোরলাইন যতটা সহজ মনে হয়েছিল, মাঠের খেলায় মরক্কো ফ্রান্সকে কঠিন চ্যালেঞ্জই দিয়েছিল।

 

বিশেষ করে বল দখল, মাঝমাঠের লড়াই এবং আক্রমণ তৈরিতে মরক্কো ছিল সমান প্রতিদ্বন্দ্বী। এবার আরও অভিজ্ঞ দল নিয়ে মাঠে নামবে তারা।

 

দুই দলের শক্তি কোথায়?

ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের আক্রমণভাগ। এমবাপ্পে ছাড়াও দলে রয়েছে একাধিক বিশ্বমানের ফুটবলার। মাঝমাঠে বল নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত ট্রানজিশন এবং ফিনিশিং-সব মিলিয়ে ফ্রান্স যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

 

অন্যদিকে মরক্কোর সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের রক্ষণ। সংগঠিত ডিফেন্স, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং অসাধারণ দলীয় সমন্বয় তাদের অন্যতম অস্ত্র।

 

কানাডার বিপক্ষে ম্যাচেও দেখা গেছে, সুযোগ কম তৈরি করেও সেগুলো কাজে লাগাতে কতটা কার্যকর মরক্কো।

 

কৌশলের লড়াই

ফ্রান্স সম্ভবত ম্যাচে বলের দখল নিজেদের কাছে রাখার চেষ্টা করবে। অন্যদিকে মরক্কো অপেক্ষা করবে প্রতিপক্ষের ভুলের জন্য। দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক, উইং দিয়ে আক্রমণ এবং সেট-পিস-এই তিন জায়গায় মরক্কো সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক।

 

অন্যদিকে এমবাপ্পের গতি এবং ফরাসি মিডফিল্ডের সৃজনশীলতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আফ্রিকার দলটির জন্য ম্যাচ কঠিন হয়ে যেতে পারে।

 

সম্ভাব্য একাদশ

ফ্রান্স: মাইক মেনিয়ান; জুল কুন্দে, উইলিয়াম সালিবা, ইব্রাহিমা কোনাতে, থিও হার্নান্দেজ; অরেলিয়েন চুয়ামেনি, এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা, আদ্রিয়ান রাবিও; উসমান দেম্বেলে, কিলিয়ান এমবাপ্পে, মার্কাস থুরাম।

মরক্কো: ইয়াসিন বুনু; আশরাফ হাকিমি, নায়েফ আগুয়ের্দ, রোমান সাইস, নুসাইর মাজরাউই; সোফিয়ান আমরাবাত, আজেদিন উনাহি, বিলাল এল খান্নুস; হাকিম জিয়েশ, ইউসুফ এন-নেসিরি, আবদে এজ্জালজুলি।

 

সেমিফাইনালের টিকিটের লড়াই

কোয়ার্টার ফাইনালের এই ম্যাচে জয়ী দল উঠবে সেমিফাইনালে। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হবে পর্তুগাল-স্পেন অথবা যুক্তরাষ্ট্র-বেলজিয়াম ম্যাচের বিজয়ী দল। ফলে শুধু শেষ আট নয়, সেমিফাইনালের পথেও বড় সুবিধা আদায়ের সুযোগ থাকবে দুই দলের সামনে।

 

২০২২ সালে আফ্রিকার প্রথম সেমিফাইনালিস্ট হয়ে ইতিহাস গড়েছিল মরক্কো। এবার তারা সেই ইতিহাসকে আরও বড় করতে চায়। অন্যদিকে এমবাপ্পেকে সামনে রেখে আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে ফ্রান্স।

 

সব মিলিয়ে ৯ জুলাইয়ের ফ্রান্স-মরক্কো লড়াই শুধু দুটি দলের ম্যাচ নয়; এটি হবে প্রতিশোধ, ইতিহাস, কৌশল এবং দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের এক আকর্ষণীয় সংঘর্ষ।


সম্পর্কিত নিউজ